বুধবার, ২২ মে, ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ১৩ জিলকদ, ১৪৪৫

শরীয়তপুরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, কারবারিরা ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’

শরীয়তপুর জেলা শহরসহ ছয়টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বহু স্পটে মাদক বেচাকেনা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

পুলিশ বলছে, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার হওয়ায় পুলিশ অভিযান চালালে মাদক কারকারীরা পুলিশের উপর হামলা চালায়। এ সময় এস আই ফরহাদ হোসেনের দুই হাত ও দুই পা ভেঙ্গে দিয়েছেণ মাদককারবারিরা।  এ সময় আরো ৩ পুলিশ আহত হয়।

শরীয়তপুর জেলার বিভিন্ন থানা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা সদরের প্রেমতলা, বাগিয়া, পাকার মাথা, পৌর ঈদগা রোড,  সদর উপজেলার মনোহর বাজার, বুড়িরহাট, গঙ্গানগর বাজার, শৌলপাড়া বাজার, চিকন্দী বাজার, নড়িয়া উপজেলার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পরিত্যক্ত বাসভবন, ভুমখাড়া, কাঞ্চনপাড়া নিলুগুন বটতলা, কাঞ্চনপাড়া বাজারের দক্ষিণ মাথা, পঞ্চপল্লি, গুলমাইজ মোড়, পাঁচক, মগারপাড় তিন দোকান মোড়, পাগলার মোড়, চাকধ বাজার, সুরেশ্বর বাংলাবাজার, চন্ডিপুর লঞ্চঘাট, ভেদরগঞ্জের মহিষার, কার্তিকপুর বাজার মাদক বেচা-কেনার স্পট হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া ভেদরগঞ্জ উপজেলার আলু বাজার ফেরিঘাট, সখিপুর, ডি এম খালী, তারাবুনিয়া, কাসেম বাজার, চরকুমালিয়া বাজার, সত্যপুর বড় ব্রিজ, গোসাইরহাট উপজেলার ধীপুর পল্লীবিদ্যুৎ এলাকা, দাসের জঙ্গল খেয়াঘাট, চর জুসর গাও, চর ধীপুর, নতুন বাজার, নাগের পাড়া বাজার, আনন্দ বাজার, গোসাইরহাট খাদ্যগুদাম এলাকা; জাজিরার টিএনটি মোড়, হেলিপেড রোড, মাঝিরঘাট, কাজিরহাট, বিলাশ বাজার, সফিকাজির মোড় এবং ডামুড্যা উপজেলায় হাসপাতাল রোড, ডামুড্যা বাজার ধান হাটা, খাদ্য গুদাম রোডসহ বহু স্পটে মাদক বেচা কেনা হচ্ছে।

গত ১৩ ফেরুয়ারী নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পাঁচগাও গ্রামের চন্ডিপুর স্কুলে মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। এ সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে স্থানীয় দীপু মাদবর ও নয়ন মাদবরকে গ্রেফতার করেন পুলিশ। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তাদের লোকজনের হামলায় এস আই ফরহাদ হোসেনের দুই হাত ও দুই পা ভেঙ্গে দিয়েছেণ মাদককারবারিরা। এ সময় আটক দীপু মাদবর ও নয়ন মাদবর পালিয়ে যান। অন্য আহতরা হলেন এসআই ইকবাল হোসেন, আক্রাম হোসেন ও এএসআই মো. ফয়সাল। তাদের স্থানীভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার অপরাধে স্থানীয় ২৩ জনকে আসামি ও অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনের নামে মামলা করে পুলিশ। মাদক মামলায় চারজনকে আসামি করে এসআই ইকবাল বাদী হয়ে নড়িয়া থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় সন্দেহজনকভাবে ছয়জনকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যা বা দিনের বেলায় এসব স্পটে মাদক বেচাকেনা চলে। এর সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক অসাধু নেতা-কর্মী জড়িয়ে পড়ছে। পাশের চাঁদপুর জেলা থেকে বিভিন্ন পরিবহন করে ও নৌযান দিয়ে ভেদরগঞ্জের আলু বাজার ফেরি ঘাট দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা শরীয়তপুর সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেয়। এ ছাড়া বরিশাল থেকে আবুপুর ফেরি ঘাট ও কুচাই পট্টি এলাকা দিয়েও দেদারসে মাদক আসছে শরীয়তপুর জেলায়।

সম্প্রতি ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানা পুলিশ বালার হাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদারীপুর শিবচর এলাকার রাজু বেপারী (৩৫), মনজু মাদবর (৪০) হাফিজুর রহমান মোল্ল্যাকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে ২৬ কেজি গাঁজাসহ।

গোসাইরহাট থানা পুলিশ কুচাই পট্টি এলাকা থেকে আট মামলার আসামি রাসেল মিয়া (৩০), একই এলাকার তিনটি মামলার আসামি মান্নান সরদারকে গ্রেপ্তার করে।

এ ব্যাপারে নড়িয়া উপজেলার লাল মিয়া, আলী কাজী ও মতিন তালুকদার বলেন, নড়িয়া থানা ও ভোজেশ্বর ফাঁড়িসহ বিভিন্ন অভিযোগ দেওয়ার পরও পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা প্রকাশ্যে এলাকায় অবস্থান করছে।

প্রতিদিনই বাঁশতলা মোড়, বৈশাখী পাড়া, চান্দনী, বাড়ৈ পাড়া এলাকায় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা দেখা যায়। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, “এলাকায় মাদকের বিস্তার আগের তুলনায় বেড়েছে। তা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের গাফলতিও আছে।”

গোসাইরহাট উপজেলার নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রাজনৈতিক নেতা বলেন, এখানে কিছু অসাধু নেতাকর্মী মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত; কিন্তু প্রশাসন তাদের কিছু বলে না।

ভেদরগঞ্জ উপজেলার তারাবুনিয়া এলাকার রহিম সরদার, আলী বেপারী বলেন, মাদকাসক্তদের উৎপাতে এলাকায় তাদের বসবাস করাই দায় হয়ে পড়েছে। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ করেন তারা।

এ ব্যাপারে শরীয়তপুর জজ কোর্টের আইনজীবী আব্দুল মান্নান তালুকদার বলেন, শরীয়তপুরে নেশাগ্রস্তদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নেশার খরচ যোগানোর জন্য নানারকম সমাজবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

নড়িয়া থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, “নড়িয়া থানায় আগের তুলনায় মাদকসেবীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। অভিযান চালাতে গিয়ে ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। এর মধ্যে নড়িয়া থানার এ এস আই ফরহাদ হোসেনের দুই হাতও দুই পা ভেঙ্গে দিয়েছে হামলাকারীরা।

“এর কারণ হলো যিনি ইয়াবা বিক্রি করছেন তিনি বহন করছেন না। শিশু, মহিলা অথবা অটোরিকশা চালকদের ব্যবহার করছেন। ফলে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আটক করলেও তাদের কাছে ইয়াবা পাচ্ছি না।