বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩১, ১১ মহর্‌রম, ১৪৪৬

টু-লেন নির্মাণে ধীরগতি পদ্মা সেতুর সুফলবঞ্চিত শরীয়তপুরবাসী

 

শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায় পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক পর্যন্ত (২৭ কিমি.) টু-লেনে উন্নতিকরণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এক হাজার ৬৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণসহ রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। ২০২০ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। সে হিসাবে চার বছরে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে পারেনি জেলা প্রশাসন।

তিনটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সড়কের কাজ দেয় শরীয়তপুর সড়ক বিভাগ। ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ না হওয়া এবং আইনি জটিলতার কারণে অনেক জায়গায় এখনো হাত দিতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মেগা প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে একটু সময় লাগে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাজটি ২০১৪ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। শরীয়তপুর সড়ক বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২৭ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ৪ লেনের জায়গা অধিগ্রহণ করা হলেও নির্মিত হচ্ছে টু-লেন। এর মধ্যে ২৮টি ছোট বড় ব্রিজ নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কোটা পাড়া ব্রিজটি নির্মাণের কাজটি ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে অনেক ব্রিজের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। মামলা জটিলতার কারণে কোথাও আটকে আছে জমি অধিগ্রহণ কাজ। অধিগ্রহণ কাজ চূড়ান্ত করতে এখনো কয়েক ধাপ বাকি আছে। ভূমি বুঝে পাওয়ার পরই কাজ শুরু করার কথা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেও কাজ করতে গড়িমসি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জেলা শহরের ফায়ার সার্ভিস এলাকা থেকে জাজিরার টিঅ্যান্ডটি মোড় পর্যন্ত প্রথম প্যাকেজের কাজে প্রেমতলা পর্যন্ত সাব বেইসসহ কার্পেটিংয়ের কাজ করা হয়েছে। কোটা পাড়া ব্রিজের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। মাঝে কিছু অংশ করা হলেও বাকি রয়েছে অধিকাংশ কাজ। দ্বিতীয়, তৃতীয় প্যাকেজের জাজিরা এলাকা থেকে নাওডোবা পর্যন্ত কিছু ব্রিজের কাজ অর্ধেক করে ফেলে রাখছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আবার কিছু এলাকায় ভেকু দিয়ে মাটি কেটে রাস্তা প্রশস্ত করার পর ফেলে রাখা হয়েছে। তবে মূল সড়কের কাজে এখনো হাত দেওয়া হয়নি।

প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো টু-লেন রাস্তা নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়ায় ও কাজের ধীরগতির কারণে হতাশ জেলাবাসী। কারণ সরু রাস্তা, ভারী যানবাহনের অধিক চাপে পুরাতন জরাজীর্ণ ও অপ্রশস্ত রাস্তাগুলো ভেঙে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অহরহ ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের রাস্তা যেতে সময় লাগছে ৪ ঘণ্টা।

বাসযাত্রী, কামাল, রহিম, ময়না বেগম ও নাজমা খানম বলেন, ঢাকা যেতে যেখানে আমাদের দেড় থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগার কথা সেখানে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগছে। আমরা শরীয়তপুরবাসী পদ্মা সেতুর সুফল থেকে বঞ্চিত।

বাসচালক বিল্লাল, দবির ফরজী বলেন, ‘সরু ও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে গাড়ি চালাতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।’

শরীয়তপুর জেলা পরিবহণ মালিক গ্রুপের সভাপতি ফারুক আহাম্মেদ তালুকদার বলেন, ‘শরীয়তপুর-নাওডোবা পর্যন্ত সড়কের নির্মাণকাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে হচ্ছে। আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য। কারণ আমরা যাত্রীদের সেবা দিতে পারছি না। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে আমাদের গাড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার গোবিন্দ দত্ত বলেন, ‘কোটাপাড়া থেকে জাজিরা পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষের পথে। মামলা জটিলতার কারণে কিছু জায়গায় অধিগ্রহণের কাজ আটকে আছে। আর জাজিরা থেকে নাওডোবা পর্যন্ত জেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগের যৌথ সার্ভে করার কাজ চলমান রয়েছে। কিছু এলাকায় ৭ ধারা ও অর্থ ছাড় করানোর কাজ চলছে।’ কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করে তৃতীয় প্যাকেজের জাজিরা থেকে নাওডোবা পর্যন্ত কাজ পাওয়া মীর হাবিবুর রহমান ও কনস্ট্রাকশনের সাইট ম্যানেজার মিলন শেখ বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গেলে স্থানীয় লোকজন বাধা দেন। অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তারা কাজ করতে দেবে না বলে জানিয়ে দেন। যার ফলে কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে।’

শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। অফিসে এলে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া যাবে। পরে অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।’ শরীয়তপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ভুইয়া রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে কাজে কিছুটা গতি কম ছিল। এখন পুরাপুরি শুরু করব। ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’

জানতে চাইলে শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ-সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম বলেন, ‘আমি জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছি দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণের কাছ শেষ করার জন্য। কাজ চলছে। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করতে পারব।