বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ২০ জিলকদ, ১৪৪৫

নড়িয়ায় ৪ বছরে ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি ১০ হাজার গৃহহীন পরিবারের।

একই পরিবারে হওয়া সত্ত্বেও এক যায়গায় বসবাস করতে পারছি না।ভিন্ন ভিন্ন স্থানে যে খানে মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছে সে সেখানেই বসবাস করছি।ছেলে বাবার সাথে যোগাযোগ নাই, আপন ভাই ভাইর সাথে যোগাযোগ নাই।আমরা নদী ভাঙ্গা মানুষেরা অন্যের জমিতে জমির মালিককে বছরে  শতাংশ প্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে ৬ শতাংশ জায়গার উপর ৬ বছর যাবৎ কোন রকম ভাবে জীবন যাপন করছি। কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাচ্ছি না আমরা নদী ভাঙ্গা কবলিত মানুষগুলো। এভাবেই গৃহহীন চিন্তাময় অনিশ্চিতভাবে জীবন কাটাচ্ছে নদী ভাঙনে ভুক্তভুগী এসব অসহায় মানুষগুলো এই কথা গুলো বলছিলেন মোক্তারের চর ইউনিয়নের ইশ্বরকাঠির গ্রামের মকবুল বেপারি।
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সর্বনাশা পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে প্রায় ১৫ হাজার ৬শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ছিল। নদীভাঙনে ফসলি জমি ও বসতভিটা বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ভাঙ্গনের পরে পানি সম্পদ উপ-মন্ত্রী গৃহহীনদের পুর্নবাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও গত ৪ বছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি।  তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে। তবে আগের ভাঙনের শিকার গৃহহীন পরিবারগুলো কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
শরীয়তপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর তীরে নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর, নড়িয়া পৌরসভা, কেদারপুর, ঘড়িসার, চরআত্রা ও নওপাড়া ইউনিয়ন অবস্থিত। ২০১৫ সাল থেকে নড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় পদ্মা ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভাঙনে অন্তত ১০ হাজার ৬শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ভাঙন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সে বছরই প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। সে বছর পদ্মা নদীতে বিলীন হয় তিনটি বাজারের সাড়ে ৬শ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আরও বিলীন হয় নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবন সহ তিনটি দ্বিতল ভবন। এর বিভিন্ন সভাসমাবেশে পানি সম্পদ উপ-মন্ত্রী একে এম এনামূল হক শামীম গৃহীনদের পূনবার্সনের আশ্বাস দেয়। কিন্তু ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন করেনি।
২০১৯ সালে ভাঙন রোধে প্রকল্পের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকায় ৮ কিলোমিটার পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধ ও ১১ কিলোমিটার এলাকা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে  চর খননের কাজ শুরু করে। ওই প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
২০১৯ সালের পর নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে। কিন্তু ১০ হাজার ৬ শ গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি পানি সম্পদ উপ-মন্ত্র একে এম এনামুল হক শামীম ও স্থানীয় প্রশাসন। গৃহহীন পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র। কারও কারও আশ্রয় হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে। অনেকে বিভিন্ন ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে খুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছে আবার কেউ, কেউ চলে গেছে বিভিন্ন চরে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বলেন, নদীভাঙনের পর অনেক পরিবারকে ঘর নির্মাণের টিন দেওয়া হয়েছিল। মানুষ তো জমি হারিয়েছে, জমি না পেলে তারা ঘর তুলবে কোথায় ?  উপজেলা প্রশাপসন গৃহহীনদের খাসজমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
কেদারপুরের এলাকার ব্যবসায়ী মকবুল হোসেন ও সুফিয়া আক্তার, আলমগীর বেপারী বলেন, পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম পুর্নবাসনের আশ্বাস দিলেও তা গত ৪ বছওে বাস্তবায়ন করেননি। ‘জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন অসহায় হয়ে পড়ব, ভাবতেও পারিনি। কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায় না। আমাদের কথা ভাবে না।
নদী ভাঙ্গা কবলিত এক ভুক্তভোগী গোলক জান বিবি বলেন, “আমার বাড়ি ঘর ৫/৬ বছর আগে নদিতে ভাইঙ্গা গেছে।সরকার থেকে একবার কিছু টিন পাইছিলাম আর আমাদের একবার কেউ এসে ও দেখলো না।”
তিনি আরও বলেন, “চেয়ারম্যানের কাছে আমি কয়েক বার গেছিলাম সে আজ দেয় কাল দেয় এমন করে গুরায় কোন সাহায্য সহযোগিতা করে না আমাগো। জাগো জন বাহার আছে বড়, বড় মাথা জন আছে হ্যাগোই দেয় আমাগো দিগে ফিরেও তাকায় না কেউ।”আছকো কয়দিন হইছে কোন ঔষুধ খাইতে পারি না হাতে টাহা পয়সা নাই। ৩হাজার টাকা বয়স্ক ভাতা পাইছি তা দিয়া দিছি জমি ভারা। দুইটা পোলা আমার একটা অসুখে ঘরে পইরা আছ,  আর একটা শশুর বাড়ি থাকে। টিভিতে দেহি কতো মাইসে ঘর পায় আমাগো কি সরকার একটা ঘর দিবো না।”
মোক্তারের চরের বাসিন্দা ফুলজান বিবি বলেন,আমাগো আগে ৩ কানি জমি ছিলো তা দিয়ে চাষাবাদ করে পয় পোলাপান নিয়ে সুখেই দিন কাটতো আমার।  নিজের সংসারে খরচ করে অন্য মানুষগো সাহায্য করতে পারতাম। পদ্মার ভাঙ্গনে আমার যায়গা জমি সহ সুখও ভাইঙ্গা গেছে।  পথের ফকির হইয়া গেছি।  পরের বাড়িতে একটু খানি যায়গা ভাড়া নিয়া তার উপরে ঘর তুইলা থাহি। দুইটা পোলা আগে ভাইত্তে থাকতো এহন ঢাহা গিয়া পরের কাম করে।আমাগো দিকে আল্লাহ ছারা দেহার কেউ নাই।
মোক্তারের চর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বাদশা শেখ বলেন, আমার ইউনিয়নের ইশ^রকাঠি,চেরাগআলী বেপারী কান্দি ও শেহের আলী মাদবর কান্দি গ্রামের অধিকাংশ জায়গা-জমি পদ্মা নদীর ভাংগনে বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে প্রায় সাড়ে ৫ শ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তারা বিভিন জায়গায় আশ্রয়কেন্দ্রের মত অন্যদের জমি নিয়ে খুপড়ি ঘর করে কষ্ট করে বসবাস করছে। সাবেক চেয়ারম্যানের আমলে ১৪৫ টি ঘর বরাদ্ধ দেওয়া হয়ে ছিল। তার মধ্যে ৪৫ টি ভাংগনের ক্ষতিগ্রস্থদেও দেওয়া হয়েছিল।
নড়িয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আহাদী হোসেন জানিয়েছেন ১৭-১৮ ও ১৯ অর্থবছরে ৬৯০৬টি পরিবার নদীভাঙনে বাড়িঘর হারিয়েছে। পদ্মার ভাঙনে ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার পরিবার বাড়িঘর হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অনেক গ্রাম, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়সহ অসংখ্য মসজিদ ও মন্দির। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া একশো পঞ্চাশ পরিবারের মাঝে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে ঘর ও জমি দেওয়া হয়েছে। ৬ হাজার পরিবারকে ঘর নির্মাণ করার জন্য টিন দেওয়া হয়েছিলো।
পর্যায়ক্রমে আরো দেওয়া হবে।
নড়িয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাশেদুজ্জামান বলেন, ভাঙনে যারা ভূমিহীন হয়েছে, তাদের যাছাই বাছাই করে টিন ও প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হবে। তবে কত লোক ভাঙ্গনে গৃহহীন হয়েছে, তা আমি এখন বলতে পারবো না।
পানি সম্পদ উপ-মন্ত্রী একে এম এনামূল হক শামীমকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেনি।