বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ২০ জিলকদ, ১৪৪৫

নওগাঁয় র‌্যাব হেফাজতে নারীর মৃত্যু, নির্যাতনের অভিযোগ

 

নওগাঁয় র‌্যাব তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ভূমি অফিসের এক কর্মচারী মারা গেছেন; যাকে নির্যাতন করা হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ।

গত বুধবার সকালে তাকে র‌্যাব তুলে নিয়ে যায়। শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

সুলতানা জেসমিন (৪৫) নামের এই নারী নওগাঁ সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস সহকারী পদে কমর্রত ছিলেন।

র‌্যাবের  দাবি, সুলতানা জেসমিনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হয়েছিল।

সুলতানা জেসমিনের মামা ও নওগাঁ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর নাজমুল হক মন্টু বলেন, তার ভাগনি বুধবার সকালে অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নওযোয়ান মাঠের সামনে থেকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে র‌্যাবের পোশাক পরা লোকজন তাকে তুলে নিয়ে যান।

“এরপর তাকে কোন ক্যাম্প নেওয়া হলো এ ব্যাপারে আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ  খবর নেই; কিন্তু সন্ধান পাইনি। দুপুর পৌনে ২টার পর জানতে পারি, সুলতানা নওগাঁ সদর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।”

সেখানে তিনি র‌্যাবের লোকজনকে দেখতে পান এবং তার ভাগনি সুলতানা কথা বলতে পারছিলেন না বলে জানান নাজমুল।

তিনি বলেন, এর কিছুক্ষণ পর সুলতানাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে তিনি মারা যান।

শুক্রবার সকাল মৃত্যু হলেও তাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয় শনিবার বিকালে। নামাজে জানাজা শেষে শনিবার রাতে তাকে নওগাঁ সরকারি গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

নাজমুল জানান, সুলতানার সঙ্গে স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয় ১৭ বছর আগে। নওগাঁ শহরের জনকল্যাণ এলাকায় একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতে। একমাত্র সন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

“সে ভূমি অফিসের একজন সামান্য কর্মচারী। এ পর্যন্ত কোনো দিন তার বিরদ্ধে কোনো দুর্নীতি কিংবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ কেউ করেননি।”

পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এ ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান কাউন্সিলর নাজমুল।

সুলতানার ছেলে শাহেদ হোসেন সৈকত গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “আমার মা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। র‌্যাবের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, যে কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।”

র‌্যাব-৫ রাজশাহী এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর নাজমুস সাকিব সাংবাদিকদের বলেন, সুলতানা জেসমিনের বিরুদ্ধে পাওয়া আর্থিক প্রতারণার একটি অভিযোগ রয়েছে। তার ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক টাকা লেনদেনের অভিযোগ ছিল।

“তার ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে আমরা তার সত্যতা পেয়েছি। অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড় এলাকা থেকে র‌্যাব হেফাজতে নেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, আটকের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে রাজশাহী নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শুক্রবার স্ট্রোকে তার মৃত্যু হয়।

আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে শনিবার দুপুরে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আটকের পর ওই নারীকে র‌্যাবের  কোনো ক্যাম্পে নেওয়া হয়নি। আটকের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পরিবারের লোকজন তার সঙ্গেই ছিল।

নির্যাতনের যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয় বলে দাবি এই র‌্যাব কর্মকর্তার।

নওগাঁ সদর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মৌমিতা জলিল বলেন, ওই নারীকে নওগাঁ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে প্রাথমিকভাবে তার হৃদরোগে আক্রান্ত হবার লক্ষণ পাওয়া যায়। তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল কিনা তা দেখা হয়নি।

জেসমিনের এক সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সুলতানা জেসমিন একজন সৎ ও ভালো কমর্চারী ছিলেন। একজন সরকারি কমচারীকে র‌্যাব কীভাবে কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে তুলে নিয়ে গেল তা বোধগম্য নয়। বিষয়টি অন্যান্য কমচারীদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। এই মৃত্যুর বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

এই মৃত্যুর বিষয়ে এখনো পর্যন্ত নওগাঁ সদর মডেল থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানান থানার এসআই এনাম।