বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩১, ১১ মহর্‌রম, ১৪৪৬

হঠাৎ ইভিএম থেকে সরল ইসি আগামী নির্বাচনে ব্যালটে ভোট ৩০০ আসনে

 

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন তারা ৩০০ আসনেই কাগজের ব্যালটে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার কমিশনের ১৭তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে দুই লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এছাড়া ইসির কাছে থাকা ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম মেরামতের জন্য সরকারের কাছ থেকেও টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। এসব কারণে কাগজের ব্যালটে ভোটের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশন সচিব মো. জাহাংগীর আলম। তবে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না হলেও আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এ মেশিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে সোমবার নির্বাচন ভবনে কমিশনের এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব). মো. আহসান হাবিব খান, বেগম রাশেদা সুলতানা, মো. আলমগীর ও মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার কেউই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। নির্বাচন কমিশন সচিব মো. জাহাংগীর আলম সভার সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান।

সচিব বলেন, আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনে ব্যালট পেপার এবং স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ভোট হবে বলে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসন্ন পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে এবং এর কার্যক্রম চলমান থাকবে। সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার কারণ সম্পর্কে সচিব বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ মেশিন মেরামতের জন্য ১ হাজার ২৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। ওই অর্থপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তার কারণে কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এ মেশিন ব্যবহার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দেয়। এছাড়া এ মেশিনে পেপার অডিট ট্রেইল না থাকায় দেশের বিশিষ্টজনদের অনেকেই এ মেশিন ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিশিষ্টজনদের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করে। এজন্য দুই লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। ওই প্রকল্প অনুমোদন না করার পর ইসির হাতে থাকা ইভিএম দিয়ে ৭০-৮০টি আসনে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আসছে। সোমবার অনেকটা হঠাৎ করেই নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল।

জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে টাকার সংকট ও রাজনৈতিক মতবিরোধ মুখ্য ছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে মো. জাহাংগীর আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই লক্ষ্যে ইভিএম কিনতে ৮ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প দেওয়া হয়। ওই প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন এগিয়ে নেয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইভিএম মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সঙ্গে কয়েক দফায় সভা করে। ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম নির্বাচন উপযোগী করতে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় ইভিএম মেরামতের ওই টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচনসংক্রান্ত অন্যান্য যাবতীয় ব্যয়ের টাকা আগামী অর্থবছরে পাওয়া যাবে। যেহেতু ইভিএম ব্যবহার উপযোগী কি না, তা পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নির্বাচন কমিশনের হাতে নেই। এছাড়া এসব কার্যক্রম পরীক্ষা করাও সময়সাপেক্ষ। এর সঙ্গে কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। সময়স্বল্পতা, অর্থ সংকট ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য-সবকিছু বিবেচনা করে হয়তো নির্বাচন কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন সচিব।

সূত্র জানায়, বৈঠকের বড় অংশজুড়েই ইভিএম নিয়ে আলোচনা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু আসনে ইভিএম ব্যবহার করার পক্ষে মত দেন এক নির্বাচন কমিশনার। যেসব ইভিএম ভালো আছে, সেগুলো বাছাই করে ব্যবহারের পক্ষে বৈঠকে কথা বলেন তিনি। তবে বেশির ভাগ নির্বাচন কমিশনার ইভিএম ব্যবহারে ঝুঁকির কথা জানান। বৈঠকে আলোচনা হয়, ইসির হাতে থাকা ইভিএম-এর পাঁচ বছর মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হয়ে যাবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইভিএম ব্যবহার করার যৌক্তিকতা ও ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। এছাড়া ইভিএম কারিগরি ও মেরামতের আর্থিক দিক বিবেচনায় কমিশন ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

সূত্র জানায়, ইসির এমন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মূলত বিদ্যমান ইভিএম অধ্যায় আগামী জুনে শেষ হতে যাচ্ছে। আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পর সেগুলো মেরামত না করায় পরিত্যক্ত হতে যাচ্ছে। বিগত কেএম নূরুল হুদা কমিশনের সময়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা প্রকল্পের আওতায় দেড় লাখ ইভিএম কিনেছিল ইসি। ওই নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে এ মেশিন ব্যবহার করা হয়। বর্তমান কমিশন আসার পর প্রথমে বড় পরিসরে, পরে অল্পসংখ্যক আসনে ইভিএমে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করে। এরই অংশ হিসাবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ আগামী নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের সুবিধার্থে সিটি করপোরেশন এবং প্রতিটি জেলার সদর আসনসংশ্লিষ্ট এলাকায় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে নিবন্ধিত ভোটারদের ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ভোটার হওয়া ব্যক্তিদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র না দেওয়ায় তাদের ১০ আঙুলের ছাপ ইসির তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত নেই। ইভিএমে ভোট নিতে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে ভোটার শনাক্ত ও ব্যালট ইস্যুর নিয়ম রয়েছে। সদর আসনগুলোয় ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে ওই ছাপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।