শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় অনিশ্চিত প্রকল্প

 

শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক চার লেন করতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দেয় ২০১৯ সালে। চার বছরে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও জমি বুঝে না পাওয়ায় প্রকল্পটিতে কাজ করবে না বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বলছে, জমি অধিগ্রহণে জেলা প্রশাসনের ধীরগতির কারণে কাজটি এগোচ্ছে না। আর জেলা প্রশাসনের দাবি, জমি অধিগ্রহণ সঠিক প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। ঠিকাদারদের কাজ না করার তথ্য তাদের জানা নেই।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যোগাযোগের জন্য ২০০১ সালে শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়কটি চালু হয়। মেঘনার নরসিংহপুর ফেরিঘাট থেকে সদর উপজেলার মনোহর বাজার পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটার। সড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে ২০১৯ সালের ১২ মার্চ একনেকে ৮৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই বছরের জুনেই জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন। সড়কের জন্য ২২৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এ জন্য সওজের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে ৪৩১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চার বছরে এখনো পুরো জমি বুঝে পায়নি সওজ। মাত্র সাড়ে ৪ কিলোমিটার অংশের ৪২ দশমিক ৫৫ একর জমি বুঝে পেয়ে সওজ। বাকি সাড়ে ২৬ কিলোমিটার সড়কের ১৮৪ দশমিক ৪৫ একর জমি অধিগ্রহণপ্রক্রিয়া এখনো চলমান।

সওজ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার লেনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলেও এখন সড়কটি ৩৩ ফুট প্রশস্ত করে দুই লেন করা হবে। সড়কটির মধ্যে ৭টি কালভার্ট প্রশস্ত ও নতুন ১৭টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। এ জন্য চারটি গুচ্ছ প্রকল্পে চারটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয় সওজ। প্রকল্প শেষ করার জন্য প্রথম দফায় মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ওই সময়ে কোনো কাজ না হওয়ায় মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

নরসিংহপুর ফেরিঘাট থেকে চরসেন্সাস মাদবরকান্দি পর্যন্ত ৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ পেয়েছে মীর হাবিবুল আলম অ্যান্ড রানা বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটি দুই কিলোমিটার অংশ পর্যন্ত ইটের খোয়া দিয়ে বালু ভরাট করেছে। আর দুটি কালভার্ট নির্মাণ করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কোনো কাজ করছে না। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মিলন শেখ বলেন, ‘২০২০ সালের ২৫ মার্চ কার্যাদেশ পাই। এরপর লোকজন নিয়ে প্রকল্প এলাকায় আসি। তিন বছর ধরে বসে আছি। এখনো জমি বুঝে পাইনি। কাজ করতে গেলে মানুষ বাধা দেয়। প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করে ফেঁসে গেছি। এখন আবার নির্মাণসামগ্রীর দাম ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। প্রকল্পের ব্যয় না বাড়ালে আমরা কাজ করতে পারব না।’

চরসেন্সাস মাদবরকান্দি থেকে মনোহর বাজার পর্যন্ত প্রথম ১৭ দশমিক ১ কিলোমিটারের কাজ যৌথভাবে পেয়েছে ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স, রিলায়েবল বিল্ডার্স ও মাইনুদ্দিন বাশি লিমিটেড নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৮ কিলোমিটারের কাজ যৌথভাবে পেয়েছে বদরুল ইকবাল, হাসান টেকনো বিল্ডার্স ও ওয়েস্টার্ন ট্রাভেশন অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ১৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু এখনো জমিই বুঝে পায়নি তারা। গত বছরের অক্টোবরে ওই প্রকল্পে কাজ না করার কথা জানিয়ে সওজকে চিঠি দেয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্সের মালিক শফিকুল আলম বলেন, ‘কার্যাদেশ পাওয়ার পর ১৮ মাস অপেক্ষা করেছি। কিন্তু তারা আমাদের জমি বুঝিয়ে দিতে পারেনি। এর মধ্যে নির্মাণসামগ্রীর দাম অনেক বেড়েছে। কত দিনে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবে, সেটারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বাধ্য হয়ে কাজ না করার কথা সওজকে জানিয়ে দিয়েছি।’

শরীয়তপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী ভূঁইয়া রেদওয়ানুর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণে ধীরগতির জন্য সড়কটির কাজ এগোচ্ছে না। ২৫ কিলোমিটার অংশের কাজ করবে না বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানিয়ে দিয়েছে। আর একটি অংশের কাজ চলছে ধীরগতিতে। তারাও বলেছে, প্রকল্প ব্যয় না বাড়ালে কাজ করবে না। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই চার লেন সড়কটির নির্মাণকাজে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান বলেন, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সঠিকভাবেই এগোচ্ছে। সওজকে যে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা সেই অংশের কাজও করছে না। আর প্রকল্পের ঠিকাদার কাজ করছে না এমন তথ্য তাঁর জানা নেই। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলবেন।

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, পুরো ৩১ কিলোমিটার সড়কই খানাখন্দে ভরা। সড়কজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত রয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহন। খুলনা থেকে চট্টগ্রামগামী দিদার পরিবহনের চালক রাশেদুজ্জামান বলেন, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক দিয়ে গেলে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ কম হয়। তাই ২০ বছর ধরে সড়কটি দিয়ে বাস চালাচ্ছেন। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা-গর্ত থাকায় অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

ট্রাকচালক মোবারক হোসেন বলেন, সড়কটি দিয়ে বেনাপোল, ভোমরা, পায়রা ও মোংলা বন্দরের পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পরিবহন করা হয়। শরীয়তপুর অংশে এলেই তাঁরা দুর্ভোগে পড়েন। বেহাল সড়কের কারণে এক ঘণ্টার পথ যেতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে।