বুধবার, ২২ মে, ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ১৩ জিলকদ, ১৪৪৫

আজ পহেলা বৈশাখ বাঙালির বাঁধভাঙা উল্লাসের দিন

বাঙালি তার অস্তিত্বের জানান দেয় প্রাণে প্রাণে, উৎসবে। বিশ্বকে বলে দেয়-আমি বাঙালি; আমার আছে গর্বের ইতিহাস। সংকল্প জানাতে পারি নতুন আগামীর। অতীত বেদনাকে ভুলে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যেতে পারি।

বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অসাম্প্র্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ। আজ পহেলা বৈশাখ। বিগত বছরের জরাকে দূরে ঠেলে বাঙালির আজ স্বপ্ন দেখার দিন, নতুন আলোয় অবগাহনের দিন, বাঙালির বাঁধভাঙা উল্লাসের দিন। হাজার বছরের ঐতিহ্যের বহমানতায় বাংলার ঘরে ঘরে আজ উৎসবের আমেজ।

বাংলা নববর্ষ ১৪৩০ উদযাপন করতে আজ লাখো মানুষ ঘরের বাইরে ছুটবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে মানুষ নববর্ষ উদযাপন করবে।

পবিত্র রমজান মাসে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে নতুন বছরকে বরণ করে নেবে মানুষ। বঙ্গাব্দ ১৪২৯-এর আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে নতুন পথচলা শুরু হবে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসবে নববর্ষ উদযাপনে একসঙ্গে গাইবে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’।

বাংলার গ্রাম, শহর-বন্দর, পথঘাট সব জায়গায় দোলা দেবে পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানরা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানাতে রমনার বটমূলে বর্ষবরণের প্রভাতী আয়োজন করছে ছায়ানট। জাগরণের সুরবাণীতে নতুন বঙ্গাব্দ-১৪৩০ কে স্বাগত জানানো হবে। সকালবেলার আলো ফুটতেই আহীর ভৈরবের সুরে, ছন্দের বন্ধনে এবারের নতুন বছর আবাহন করবেন তারা।

রমনা উদ্যানের প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেলেও অনুষ্ঠান দেখা যাবে।

নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেওয়ার অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ইউনেস্কোর অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এ উৎসব বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বহন করে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি।

মঙ্গল শোভাযাত্রায় সারা বিশ্বে শান্তির আহ্বান জানানো হবে। পবিত্র রমজানে এবার মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে বের হয়ে শাহবাগ ঘুরে আবার চারুকলায় শেষ হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় শুরু হবে।

পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটির দিন। ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩০’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে।

ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদায় বাংলা নববর্ষ উদ্?যাপন করবে। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান আবশ্যিকভাবে জাতীয় সংগীত ও এসো হে বৈশাখ গান পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হবে।

দেশের শরীয়তপুরসহ সব জেলা ও উপজেলায় বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। বাংলা নববর্ষের তাৎপর্য এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস ও ইউনেস্কো কর্তৃক এটিকে অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো বাংলা নববর্ষের ওপর বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি টিভি, বাংলাদেশ বেতার, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্তৃক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃক ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে নববর্ষ মেলা, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, কপিরাইট অফিস ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, কুইজ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট/একাডেমিগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। এছাড়া রচনা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ মেলা যা আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

বাংলা নববর্ষে সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার ও ইফতারের আয়োজন করা হবে। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত আজ। শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ থাকছে।

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে ও যথাযথ আড়ম্বরে বাংলা নববর্ষ উদ্?যাপন করা হবে। সকালে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে থাকছে বৈশাখী র‌্যালির আয়োজন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো এ উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। অভিজাত হোটেল ও ক্লাব বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার/ইফতারের আয়োজন করেছে।

‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩০’ উদযাপন উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র, ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভ্রাম্যমাণ টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে।

বর্ষবরণে প্রস্তুত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : জবি প্রতিনিধি জানান, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) বাংলা নববর্ষ-১৪৩০ জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হতে যাচ্ছে। পহেলা বৈশাখ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রকাশনা উৎসবসহ নানা আয়োজন থাকছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা সকাল সাড়ে ৯টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে ভিক্টোরিয়া পার্ক হয়ে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসবে। শোভাযাত্রায় কবুতরের প্রতিকৃতি তুলে ধরা হবে। এছাড়াও বড় আকারের ফুল, মৌমাছি, বাঘ ও পেঁচার মুখোশ স্থান পাবে। এতে নেতৃত্ব দেবেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।