মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪, ১০ বৈশাখ, ১৪৩১, ১৩ শাওয়াল, ১৪৪৫

শরীয়তপুরের বিচারক ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে হাই কোর্টে তলব

 

কয়েকজন আসামি ও তাদের স্বজনদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে ৭২ লাখ টাকার চেক আদায়ের অভিযোগের মুখে থাকা শরীয়তপুরের নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্ম কর্তকর্তা  শেখ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানকে তলব করেছে হাই কোর্ট।

একই সঙ্গে উচ্চ আদালতে জামিন পাওয়ার পরও আসামিদের কারাগারে পাঠানোয় শরীয়তপুরের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তলব করা হয়েছে। আগামী ১৬ জুলাই তাদের সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে।

আর ৭২ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক ও শরীয়তপুরের পুলিশ সুপারকে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।

বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলামের হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এ আদেশ দেয়।

আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আনিসুর রহমান।

আইনজীবী সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, গত ২৯ মে তিন আসামিকে ৬ সপ্তাহের জামিন দেয় উচ্চ আদালত। এরপরও তাদের গ্রেপ্তার করে নির্যাতন চালায় পুলিশ। পরে ১ জুন আসামিদের হাকিম আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

“উচ্চ আদালতের আদেশ থাকায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে জামিন দেওয়া। এটা না করে তিনি কারাগারে পাঠিয়েছেন। এ ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ বিষয়টি আজকে নজরে আনার পর দুই পুলিশ অফিসার এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তলব করেন হাই কোর্ট। পাশাপাশি পুলিশের মহাপরিদর্শক ও শরীয়তপুরের পুলিশ সুপারকে এ বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।”

গত ২১ মে শরীয়তপুরের জাজিরার আহাদী বয়াতিকান্দি গ্রামের শাহীন আলম শেখ ও তার সহযোগী ছোট কৃষ্ণনগর গ্রামের সেকান্দার মাদবরের কাছ থেকে ১৭ হাজার ডলার, টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। এ ঘটনায় গত ২৩ মে নয় জনকে আসামি করে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় একটি মামলা করেন শাহীন আলম।

মামলায় নাওডোবা বাজারের ব্যবসায়ী আবু জাফরের চার আত্মীয়কে মামলায় আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন জাফরের চাচা রশিদ চোকদার, তার ছেলে বকুল চোকদার, জাফরের আরেক চাচা বাদশা চোকদার ও তার ছেলে সাদ্দাম চোকদার।

ওই চার আসামির ভাষ্য, গত ২৯ মে তারা উচ্চ আদালত থেকে ৬ সপ্তাহের জামিন পান। এরপর রাতে তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে তাদের ওপর চড়াও হন জাজিরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল ব্যাপারী ও ছিনতাই মামলার বাদীর আত্মীয় শহীদুল ইসলাম। পরে রুবেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির এবং ওসি শেখ মোস্তাফিজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে কেরাণীগঞ্জের ওই বাসায় ডেকে নেন। সেখানেই একটি কক্ষে আটকে তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

পরে ১ জুন আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

পরদিন ২ জুন পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া অভিযোগে ব্যবসায়ী জাফর বলেন, ৩১ মে রাতে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে তুলে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে ওসির কক্ষে আটকে চোখ বেঁধে দুই ঘণ্টা ধরে পেটানো হয়। এক পর্যায়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও ওসি মোস্তাফিজুর তাকে চার আত্মীয়ের পক্ষে ৭২ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এর বিনিময়ে ওই আত্মীয়দের মালিকানাধীন নাওডোবা বাজারের দুটি দোকান তার নামে লিখে দেওয়ার কথা বলা হয়।

ব্যবসায়ী জাফরের ভাষ্য, নির্যাতনের এক পর্যায়ে ৭২ লাখ টাকার চেক লিখে দিতে রাজি হলে তার চাচা রশিদ চোকদারের জিম্মায় ভোরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে ন্যাশনাল ব্যাংক নাওডোবা শাখায় নিজের হিসাব নম্বরের ৫টি চেকে ৭২ লাখ টাকা লিখে দেন আবু জাফর। পরে চেকগুলো ওসি মোস্তাফিজুরের কাছে দেওয়া হয়।

ওই ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ বদিউজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয়েছে জেলা পুলিশ লাইনসে।

গত ১১ জুন বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছিলেন আইনজীবী মজিবুর রহমান। তখন আদালত লিখিত আবেদন করতে বলেছিল।

দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মঙ্গলবার সকালে হাই কোর্টে আবেদন করেন আইনজীবী মজিবুর। এ সময় তিনি কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের কপি আদালতে জমা দেন। শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেন।