শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

‘নির্যাতন করে চেক লিখে নেওয়া’: শরীয়তপুরের সেই অতিরিক্ত এসপি বরখাস্ত

 

শরীয়তপুরের জাজিরায় এক ব্যবসায়ীকে নির্যাতনের পর ৭২ লাখ টাকার চেক লিখে নেওয়ার ঘটনায় নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ বরখাস্তের কথা জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনিরের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ জন্য সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯ (১) এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ১২(১) অনুযায়ী অভিযুক্তকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা সমীচীন বিবেচিত হয়।”

জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, “রাসেল মনির বাংলাদেশ সার্ভিস রুল (বিএসআর) পার্ট-১ বিধি ৭১ অনুযায়ী খোরপোষ পাবেন।”

এর আগে একই ঘটনায় পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও পরিদর্শক (তদন্ত) সুরুজ উদ্দিন আহম্মেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

গত ২১ মে শরীয়তপুরের জাজিরার আহাদী বয়াতিকান্দি গ্রামের শাহীন আলম শেখ ও তার সহযোগী ছোট কৃষ্ণনগর গ্রামের সেকান্দার মাদবরের কাছ থেকে ১৭ হাজার ডলার, টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। এ ঘটনায় গত ২৩ মে নয়জনকে আসামি করে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় একটি মামলা করেন শাহীন আলম।

মামলায় নাওডোবা বাজারের ব্যবসায়ী আবু জাফরের চার আত্মীয়কে মামলায় আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন- জাফরের চাচা রশিদ চোকদার, তার ছেলে বকুল চোকদার, জাফরের আরেক চাচা বাদশা চোকদার ও তার ছেলে সাদ্দাম চোকদার।

ওই চার আসামির ভাষ্য, গত ২৯ মে তারা উচ্চ আদালত থেকে ছয় সপ্তাহের জামিন পান। এরপর রাতে তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে তাদের ওপর চড়াও হন জাজিরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল ব্যাপারী ও ছিনতাই মামলার বাদীর আত্মীয় শহীদুল ইসলাম।

পরে রুবেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির এবং ওসি শেখ মোস্তাফিজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে কেরাণীগঞ্জের ওই বাসায় ডেকে নেন। সেখানেই একটি কক্ষে আটকে তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

পরে ১ জুন আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

পরদিন ২ জুন পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ব্যবসায়ী জাফর। সেখানে তিনি বলেন, “৩১ মে রাতে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে তুলে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে ওসির কক্ষে আটকে চোখ বেঁধে দুই ঘণ্টা ধরে পেটানো হয়। একপর্যায়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও ওসি মোস্তাফিজুর তাকে চার আত্মীয়ের পক্ষে ৭২ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এর বিনিময়ে ওই আত্মীয়দের মালিকানাধীন নাওডোবা বাজারের দুটি দোকান তার নামে লিখে দেওয়ার কথা বলা হয়।”

ব্যবসায়ী জাফরের ভাষ্য, নির্যাতনের এক পর্যায়ে ৭২ লাখ টাকার চেক লিখে দিতে রাজি হলে তার চাচা রশিদ চোকদারের জিম্মায় ভোরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে ন্যাশনাল ব্যাংক নাওডোবা শাখায় নিজের হিসাব নম্বরের পাঁচটি চেকে ৭২ লাখ টাকা লিখে দেন আবু জাফর। পরে চেকগুলো ওসি মোস্তাফিজুরের কাছে দেওয়া হয়।

ওই ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ বদিউজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয় জেলা পুলিশ লাইনসে।

গত ১১ জুন বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী মজিবুর রহমান। তখন আদালত লিখিত আবেদন করতে বলেছিল।

গত ১৩ জুন এ আবেদনের শুনানি শেষে শরীয়তপুরের নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানকে তলব করে হাই কোর্ট।

একইসঙ্গে উচ্চ আদালতে জামিন পাওয়ার পরও আসামিদের কারাগারে পাঠানোয় শরীয়তপুরের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তলব করা হয়। আগামী ১৬ জুলাই তাদের সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে।

আর ৭২ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক ও শরীয়তপুরের পুলিশ সুপারকে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।

বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলামের হাই কোর্ট বেঞ্চ এসব আদেশ দেয়।