বুধবার, ২২ মে, ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ১৩ জিলকদ, ১৪৪৫

উপচে পড়ছে নদীর পানি দুই জেলায় বন্যা, দুটিতে শঙ্কা

টানা ভারি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, সুরমা, সোমেশ্বরী ও পুরাতন সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কয়েকটি পয়েন্টে সোমেশ্বরী, সুরমা আর পুরাতন সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এ কারণে লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার কয়েকটি এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে।

সংস্থাটি জানায়, কয়েকদিন ধরে দেশের ভেতরে ও উজানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ৩১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে জাফলংয়ে ২৪৫, পঞ্চগড়ে ২৩০, ছাতকে ২১৮, জারিয়াজঞ্জাইলে ১৭৫ ও সুনামগঞ্জে ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশে বৃষ্টিপ্রবণ ১৫টি এলাকার মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে ডালিয়ায় ৫৮ মিলিমিটার। অন্যদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির প্রবণতা কমেছে। জলপাইগুড়িতে ৫৬ আর শিলংয়ে ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এসব পানি বন্যা তৈরি করেছে।

এফএফডব্লিউসির সর্বশেষ বুলেটিনে দেখা যায়, ছাতক ও সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি সকাল ৯টায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ১৬ সেন্টিমিটার ও ছাতকে ১৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। একই সঙ্গে দিরাই উপজেলা পয়েন্টে পুরাতন সুরমার পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনার কমলাকান্দায় সোমেশ্বরীর পানি বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জের উপজেলা দোয়ারা বাজারের বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একই অবস্থা তাহিরপুরে। এফএফডব্লিউসি জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুশিয়ারা, মনু-খোয়াই ব্যতীত প্রধান নদনদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ঠাকুরাকোনা-কলমাকান্দা সড়ক ঝুঁকিতে পড়েছে। গোমাই সেতু থেকে পাবই মোড় পর্যন্ত তিনটি স্থানে সড়কের পাশের ব্লক ধসে গেছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি জানান, কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার অর্ধশত বিদ্যালয়ের মাঠও পানিতে তলিয়ে আছে। উপজেলা প্রকৌশলী শুভ্রদেব চক্রবর্তী বলেন, উপজেলার কাঁচাপাকা ১০-১৫টি রাস্তার বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে কলমাকান্দা-বরুয়াকোনা সড়ক, মন্তলা-ইসবপুর, উদয়পুর-বড়খাপন, বাহাদুরকান্দা-বাসাউড়া, ঘোষপাড়া-হরিণধারা, কলমাকান্দা-বিশরপাশা সড়কে যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সবকটি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাউবোর তথ্যমতে, জেলায় রোববার বছরের সর্বোচ্চ ৩৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার সুনামগঞ্জে ১৭০ মিলিমিটার এবং ছাতকে ২১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, খোয়াই করাঙ্গী ও সুতাং নদীর পানি আবার বাড়তে শুরু করেছে। সোমবার খোয়াই নদীর পানি বাল্লা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, সোনাই নদী ও জুড়ী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাকালুকি হাওড়পারে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হাওড়পারের বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর, বর্নি ও সুজানগর ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা জানান, ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে টানা বৃষ্টিতে হাওড়ের পানি বাড়ছে। হাকালুকি পর্যটন এলাকার বন বিভাগের বিট অফিসের আশপাশ পানিতে তলিয়ে গেছে।

ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, ছয় দিনের ভারি বর্ষণে ময়মনসিংহ মহানগরীর ১৯নং ওয়ার্ডের বলাশপুর ও ভাটিকাশর এলাকার রাস্তা ও বাসাবাড়ি হাঁটুসমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এলাকায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষাকাল এলে এ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। সোমবার দুপুরে সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সিটি মেয়র বলেন, তিনটি বড় ড্রেনের নির্মাণকাজ চলছে। এগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না।

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান-সুরমা, চেলা, মরা চেলা, চিলাই, চলতি, কালিউরি, খাসিয়ামারাসহ বিভিন্ন নদীর উপচেপড়া পানিতে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। চিলাই নদীর রাবারড্যাম সংলগ্ন ক্যাম্পেরঘাট এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে দোয়ারাবাজার উপজেলার বগুলাবাজার ইউনিয়নের ক্যাম্পেরঘাট, আন্দাইরগাঁও, বগুলা, চান্দেরঘাট, সোনাচড়া, নোয়াগাঁও, রামনগর, তেরাকুড়ি ও কান্দাগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রবিশস্যসহ শত শত হেক্টর আমনের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। সিলেট ব্যুরো জানায়, গোয়াইনঘাট উপজেলার সালুটিকর-গোয়াইনঘাট বন্যায় তলিয়ে গেছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সিলেটে সকালের দিকে নদ-নদীর পানি কম ছিল, সন্ধ্যার দিকে গিয়ে বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের মেঘালয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।