শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১০ ফাল্গুন, ১৪৩০, ১২ শাবান, ১৪৪৫

জাজিরার পদ্মানদীতে নৌ-পুলিশের অভিযানে দুই চাঁদাবাজ আটক

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার অন্তর্গত পদ্মানদীর কুন্ডেরচরের বাবুরচর এলাকা থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করা একটি স্টীলের ট্রলার এবং আদায়কৃত চাঁদার টাকাসহ হাতেনাতে দু’জন চাঁদাবাজকে আটক করেছে মাঝীরঘাট নৌ-পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাঝীরঘাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাসেল আহমেদ।

শনিবার (২২-জুলাই) ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত মাঝীরঘাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। এসময় তাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করা একটি স্টীলের  ট্রলার এবং আদায়কৃত চাঁদার কিছু টাকা জব্দ করা হয়। পরে আটককৃতদের বিরুদ্ধে জাজিরা থানায় ১১/১০৯ নম্বরের একটি মামলা দায়ের করে তাদেরকে আদালতে প্রেরণ করা হয়।

আটককৃতরা হলেন, জাজিরার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের বাবুরচরের সরল খাঁর কান্দি এলাকার মৃত নয়ন খাঁর ছেলে মফিজুল খাঁ(২০) এবং লিটন মুন্সির ছেলে সবুজ মুন্সি(২১)। তবে আটককৃতরা তাদের নিয়ন্ত্রণকারী মূল চাঁদাবাজ আলআমিন খাঁ এবং সুরুজ বেপারির অধীনে দৈনিক হাজিরায় শ্রমিক হিসেবে ট্রলারে কাজ করতেন বলে জানান এবং জব্দকৃত ট্রলারটিও তাদেরই বলে দাবী আটককৃতদের।

এ বিষয়ে মাঝীরঘাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির আইসি তপন কুমার বিশ্বাস জানান, নদীতে চাঁদাবাজির গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জাজিরার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের অন্তর্গত পদ্মানদীর বাবুরচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করি। পরে আমি নিজে বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদেরকে আদালতে প্রেরণ করি।

উল্লেখ্য: পদ্মার কুন্ডেরচর এলাকায় নদীর এই পথে যাতায়াতকারী বাল্কহেডসহ বিভিন্ন নৌযান থেকে জোরপূর্বক মারধর করে বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর চাঁদাবাজচক্র। ভয়ঙ্কর এই চাঁদাবাজ চক্রটিকে স্থানীয় রফিক খাঁ, আলমগীর মল্লিক, জসিম মল্লিক, ফিরোজ খাঁ, দুলাল মাদবর, আলআমিন খাঁ এবং সুরুজ বেপারিসহ অন্তত ১০-১৫ জন নিয়ন্ত্রণ করে বলে একাধিক সুত্রে জানা যায়। যাদের অধীনে প্রায় ২০-২৫ টি স্পীডবোট ও ট্রলার দিয়ে চলে চাঁদাবাজি।

তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ভয়ঙ্কর চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় রফিক খাঁ এবং আলমগীর মল্লিক। অন্যান্য চাঁদাবাজদের অভিযোগ রয়েছে নদীতে মাঝেমধ্যে অনেকের চাঁদাবাজির বোট লোকজনসহ আটক হলেও অজানা ইশারায় অভিযানের ঠিক আগ মুহুর্তেই এদের বোট চাঁদা উত্তোলনের স্পট থেকে অন্যত্র সরে যায়। যার ফলে অধিকাংশ চাঁদাবাজদের বোট মাঝেমধ্যে নৌ-পুলিশের কাছে ধরা খেলেও তাদের বোট সাধারণত অধরাই থেকে যায়।

এছাড়াও ভয়ঙ্কর এই চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট কুন্ডেরচর ইউনিয়নের গন্ডি ছাড়িয়ে বর্তমানে বিলাশপুর ইউনিয়ন , জাজিরা ইউনিয়ন এমনকি পার্শ্ববর্তী নড়িয়া উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। যার ফলে পদ্মানদীর এই নৌ-পথটি এখানে চলাচলকারী নৌ-যানগুলোর জন্য ভয়াবহ একটি জায়গা হিসেবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত এবং পরিচিত হয়ে পড়েছে সবার কাছে। প্রশ্ন উঠেছে, পদ্মানদীর এই এলাকাটিতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা কি কখনোই সম্ভব হবেনা তাহলে?

কুন্ডেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন বেপারি নৌ-পুলিশের প্রতি অভিযোগ করে বলেন, তাদের স্বদিচ্ছা থাকলেই কেবল এখানকার চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব। তবে বিভিন্নভাবে আমরা জানতে পেরেছি, চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের সাথে নৌ-পুলিশের সুরেশ্বর ফাঁড়ি এবং মাঝীরঘাট ফাঁড়ির দায়িত্বশীলদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তাছাড়া চিহ্নিত চাঁদাবাজ হোতাদের বিরুদ্ধে কখনোই কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যার ফলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যার্থ হয়েছে নৌ-পুলিশ।

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: কামরুল হাসান সোহেল জানান, নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নৌ-পুলিশের। সুতরাং আমরা নিয়মিত সমন্বয় সভাগুলোতে মাঝীরঘাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্তদেরকে এই রুটে চাঁদাবাজির বিষয়টি সম্পর্কে শক্ত অবস্থান নেয়ার জন্য বলে থাকি। এছাড়া মাঝেমধ্যে কিছু কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং চাঁদাবাজদের বোটসহ আটকও করা হয়।

নৌ-পুলিশের চাঁদপুর এলাকার পুলিশ সুপার (এসপি) কামরুজ্জামান জানান, আমাদের নৌ-পুলিশ নিয়মিত টহল দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে চেষ্টা করে যাচ্ছে চাঁদাবাজি বন্ধ করার। তবুও চাঁদাবাজরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করায় বারবার অভিযান দিয়েও চাঁদাবাজদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যেকোনোভাবেই হোক এই এলাকাটিকে চাঁদাবাজমুক্ত রাখার।