বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন, ১৪৩০, ১৭ শাবান, ১৪৪৫

চাঁদপুর-শরীয়তপুর নৌপথে ফেরি কম চলায় বিপাকে চালক ও ব্যবসায়ীরা

শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌ-পথে ফেরি চলছে কম। শুধু রাতে শরীয়তপুরের আলুর বাজার ফেরিঘাট থেকে ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে। এতে ফেরিঘাটে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা থাকতে হয়ে বলে এ পথের যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

পণ্যবাহী ট্রাকচালকেরা বলেন, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক বন্ধ রাখায় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ৪৫ কিলোমিটার বেশি পথ ঘুরে চলাচল করছে। এতে তাঁদের সাড়ে চার হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও শরীয়তপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্র জানায়, শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বিভিন্ন যানবাহন চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলাচল করে। এ ছাড়া পায়রা বন্দর, মোংলা বন্দর, ভোমরা স্থলবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে আমদানি-রপ্তানির পণ্য নিয়ে ট্রাক এ সড়ক দিয়ে শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌপথের ফেরি পারাপার হয়ে চলাচল করে। কিন্তু দুটি স্থানে সংস্কার কাজ চলায় ১৪ আগস্ট থেকে এই সড়ক দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌ-পথে ৭টি ফেরি দিয়ে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০টি যানবাহন পারাপার করা হতো। কিন্তু পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ঘাটে তেমন গাড়ি আসছে না। যাত্রীবাহী বাস ও শরীয়তপুর-মাদারীপুরের মাছ ব্যবসায়ীদের ছোট পিকআপ চলাচল করছে। গাড়ি কমে যাওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ ফেরি চলাচল কমিয়ে দিয়েছে। এখন দুটি ফেরি চলাচল করছে। ভেদরগঞ্জের আলুর বাজার ঘাট থেকে রাতে দুইটি ও চাঁদপুরের হরিণা ঘাট থেকে দিনে একটি ও রাতে দুইটি ট্রিপ দিচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়কের দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার। এখানে ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার লেন সড়ক নির্মাণের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চার লেন প্রকল্পের বাইরে থাকায় সড়কের সদর উপজেলার বুড়িহাট বাজারের ৩০০ মিটার অংশ ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা সদরের ৭০০ মিটার অংশ সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই অংশের নির্মাণকাজ চলার সময় কোনো যানবাহন চলাচল করলে সমস্যা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সওজ বুড়িরহাট থেকে ভেদরগঞ্জ উপজেলা সদর পর্যন্ত সাত কিলোমিটার অংশে যানবাহন চলাচল ৬ আগস্ট থেকে বন্ধ করে দেয়। তখন বিকল্প হিসেবে যানবহনগুলো বুড়িরহাট-ডামুড্যা ও ডামুড্যা-নারায়ণপুর সড়ক ব্যবহার করে আবার ওই সড়কে উঠে চলাচল করছিল।

ভারী যানবাহন চলাচল করলে উপজেলা সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে এলজিইডি সড়কটি দিয়ে ট্রাক চলাচলে আপত্তি জানায়। এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ১৪ আগস্ট আঞ্চলিক সড়ক পরিবহন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয় সংস্কারকাজ চলাকালীন ১৫ আগস্ট থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দুই মাস চাঁদপুর-শরীয়তপুর সড়কে সব ধরনের ভারী যানবাহন (পণ্যবাহী ট্রাক) চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে হালকা গাড়ি ও যাত্রীবাহী বাস বিকল্প এলজিইডির সড়ক দিয়ে চলাচল করতে পারবে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে শরীয়তপুরের আলুর বাজার ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের পন্টুনে তিনটি ফেরি নোঙর করে রাখা হয়েছে। ঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস ও চারটি মাছ পরিবহনের পিকআপ বসে আছে। ফেরি ছেড়ে না যাওয়ায় এগুলো সকাল থেকে অপেক্ষা করছে।

নাসরিন আক্তার ছেলেকে নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে নোয়াখালীতে যাওয়ার জন্য কমফোর্ট সার্ভিসের বাসে চড়েছেন। বেলা ১১টা থেকে আলুর বাজার ঘাটে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, ‘ঘাটে বসে অপেক্ষা করছি। যানবাহন কম থাকায় ফেরি ছাড়ছে না। আমরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছি।’

কমফোর্ট সার্ভিসের বাসচালক মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আগে ভোররাতে খুলনা থেকে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে আসতাম। দুপুরের পরপর চট্টগ্রামে পৌঁছে যেতাম। কিন্তু ফেরি না থাকায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাটে বসে থাকতে হয়। যাত্রীরা আমাদের গালাগাল দেন।’

মাছ ব্যবসায়ী ইউসুফ ফকির বলেন, ‘নোয়াখালীর রামগতি থেকে মাছ নিয়ে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি। কয়েক দিন ধরে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক নেই। ৮-১০ ঘণ্টা ফেরির জন্য ঘাটে বসে থাকতে হয়। আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

সাতক্ষীরা-চট্টগ্রামে চলাচলকারী ট্রাকচালক আবদুস সামাদ বলেন,‘বিভিন্ন পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম-সাতক্ষীরা পথে যাতায়াত করি। ১০-১২ দিন ধরে চাঁদপুর-শরীয়তপুর সড়কে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকা দিয়ে চলাচল করায় সময় ও খরচ বেশি হচ্ছে।’

বিআইডব্লিউটিএর আলুর বাজার ঘাটের ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘সড়কে পণ্যবাহী ট্রাক বন্ধ করার বিষয়টি আমাদের জানানো হয়নি। ট্রাক না আসায় ফেরি কম চালানো হচ্ছে। এতে আমাদের অনেক টাকা লোকসান হচ্ছে।’

সওজের শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী ভূঁইয়া রেদওয়ানুর রহমান বলেন, সড়কের দুটি স্থানে সংস্কার চলায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মদ বলেন, সংস্কারকাজ করার সময় সেখানে যানবাহন চলাচলের পরিস্থিতি থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে দুই মাস ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এ সময়ে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো পদ্মা সেতু হয়ে চলাচল করতে পারবে।