বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩১, ১১ মহর্‌রম, ১৪৪৬

শরীয়তপুরে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিখোঁজ ৭ যুবক

 

উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে প্রথমে লিবিয়া পাড়ি জমান তারা। এরপর অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ওঠেন। তখন থেকে তিন মাস ধরে খোঁজ নেই শরীয়তপুরের ওই সাত যুবকের। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে এখন তাদের হদিস মিলছে না। পাশাপাশি দালাল চক্রকে নিখোঁজ প্রত্যেকের দিতে হয়েছে ৮-১০ লাখ টাকা করে। নিখোঁজদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

নিখোঁজ সাত যুবক হলেন ডামুড্যা উপজেলার বিন্দাইকাঠি গ্রামের রফিক বেপারির ছেলে কামাল বেপারি (৩৫), মঠেরকান্দি গ্রামের শাহ আলম বেপারির ছেলে আকবর বেপারি (৩০) ও তার খালাতো ভাই সদর উপজেলার দরি হাওলা গ্রামের রূপচান ফকিরের ছেলে শওকত ফকির (২৭), চর যাদবপুর গ্রামের আতিকুর মোড়লের ছেলে শামিম মোড়ল (১৮), চর চাটাং গ্রামের কালাম মোড়লের ছেলে জাকির হোসেন মোড়ল (৩২), ভেদরগঞ্জ উপজেলার শাহাদাৎ হোসেন (৩৪) ও হারুন বেপারি (৪০)।

২০২২ সালে দালাল চক্রকে ৮-১০ লাখ করে টাকা দিয়ে লিবিয়া যান ওই সাত যুবক। শুরুতে কয়েক দিন তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ থাকলেও এ বছরের ২৭ মে থেকে তাদের কোনো হদিস মিলছে না।

নিখোঁজ হওয়া যুবকদের পরিবারের সদস্যরা জানান, রফিক, আকবর, শওকতকে ডামুড্যার গঙ্গেসকাঠি গ্রামের মজিবর (মজু) বেপারির লিবিয়া প্রবাসী ছেলে বাচ্চু বেপারি (দালাল) ইতালি যাওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রত্যেকের থেকে আট লাখ টাকা করে নেন। ভুক্তভোগীদের স্বজনরা দালাল বাচ্চুর বাবা মজিবর ও তার ভাইকে টাকা দেন। এছাড়া নিখোঁজ জাকির ও তার ভাতিজা শামিম ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে আরেক লিবিয়া প্রবাসী দালাল আক্তার ছৈয়ালের মাধ্যমে পাঁচ মাস আগে লিবিয়া যান। আক্তার সদর উপজেলার হাজতখোলা গ্রামের মান্নান ছৈয়ালের ছেলে। এই যুবকদের ২৭ মে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য নৌকায় ওঠান বাচ্চু-আক্তারসহ বাকি দালালরা।

নিখোঁজ যুবকদের সঙ্গে নৌকার সহযাত্রী রাজন মাদবরের ভাই ফজলু মাদবর জানান, আমার ভাইকেও বাচ্চু বেপারি ২৭ মে অন্যদের সঙ্গে নৌকায় ওঠান। সেখানে বাচ্চু বেপারি ও তার স্ত্রীর বড় ভাই আক্তার ছৈয়াল এবং বাংলাদেশের আরও কয়েকটি জেলার দালালদের লোক ছিল। এই দালালদের প্রধান হলেন বাচ্চু বেপারি। বাচ্চু বেপারির প্রধান হলেন লিবিয়ার নাগরিক। তারা ওই নৌকায় আমার ভাইসহ ৪৩ জনকে ওঠান। তখনই ওই নৌকা ডুবো ডুবো অবস্থায় ছিল। তখন ১১ জন যাত্রীকে নামিয়ে দিয়ে ৩২ জন নিয়ে আনুমানিক সকাল ৬টায় ইতালির উদ্দেশ্যে নৌকা ছাড়ে। ১ ঘণ্টা চলার পরই নৌকাটি সাগরে ডুবে যায়। তখন আমার ভাইসহ বাংলাদেশের পাঁচজন ওই দিন রাত ১২টায় তীরে আসে। পরবর্তী সময়ে কী হয়েছিল সেটা আর বলতে পারেন না। নৌকার আর এক সহযাত্রী ফয়সাল বলেন, আমাকে প্রায় দুই মাস ঘরে আটকে রাখা হয়। লিবিয়া থেকে নৌকা ছাড়ার কিছু সময় পর আমিসহ ৮ জনকে সাগরে ফেলে দেয়। আমি সাঁতরে পাড়ে এসে বাগানে আশ্রয় নিই।

এদিকে দালাল আক্তার ছৈয়ালকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রী নারগিস বেগমের কাছে জাকির ও শামিমের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তারা কোথায় আছেন আমার স্বামী জানেন। তাদের লিবিয়া নেওয়ার জন্য এই দুজনের পরিবার বিভিন্ন সময়ে আমার কাছে টাকা দিয়ে যেত, সেটা আমি আমার স্বামীকে পাঠিয়ে দিতাম। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।

দালাল বাচ্চু বেপারি জানান, যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদেরকে ইতালি পাঠানোর জন্য টাকা নিয়েছিলাম। তবে তারা যে পরিমাণের কথা বলেছে তার থেকে কম নিয়েছি। শুনেছি সাগরে নৌকা ডুবে তারা মারা গেছেন। এর জন্যই তাদের পরিবারকে জানাতে পারিনি।

শরীয়তপুর জেলা পুলিশ সুপার মাহবুবুল আলম বলেন, কেউ লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।