বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ২০ জিলকদ, ১৪৪৫

পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ অস্তিত্বহীন মাদ্রাসার নামে অর্ধকোটি টাকা লোপাটের চেষ্টা

 

নেই কোনো মাদ্রাসা ভবনের অস্তিত্ব। আদৌ এখানে মাদ্রাসা ছিল কিনা তাও সঠিকভাবে বলতে পারছেন না কেউ। এরপরও ১টি গুদামঘর ও ১টি ক্লাব ঘরকে মাদ্রাসা ভবন দেখিয়ে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ প্রকল্পের ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার ৭৫৮ টাকা আত্মসাতের চেষ্টায় মরিয়া একটি প্রভাবশালী চক্র। শুধু কি তাই! এরই মধ্যে চক্রটির হাতে পৌঁছে গিয়েছে অধিগ্রহণের ৮ ধারার নোটিশ। এবার টাকা পাওয়ার পালা। কীভাবে এটা সম্ভব, তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে কৌতূহল! সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করলে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এ ঘটনা ঘটেছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নশাসন ইউনিয়নের মাঝিরহাট এলাকায়। এখানে নশাসন ইবতেদায়ি সাতন্ত্র মাদ্রাসা নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকলেও মাদ্রাসার সভাপতি দাবি করে একজন বলছেন মাদ্রাসার স্থাপনা রয়েছে। কিন্তু ওই একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, মাদ্রাসার ভবন ওখানে বহু বছর আগে ছিল। এখন মাদ্রাসার কোনো ভবন নেই। অধিগ্রহণে মাদ্রাসার নামে আসা ৭ ও ৮ ধারার কোনো নোটিশ তিনি পাননি। সভাপতি তাকে এ বিষয়ে কিছুই জানাননি।

সরেজমিন গিয়ে এবং জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জাজিরা উপজেলার নাওডোবা প্রান্ত থেকে জেলা শহর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার এলাকায় শরীয়তপুর-জাজিরা সড়ক এবং নাওডোবা পদ্মা ব্রিজ অ্যাপ্রোচ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এর জন্য ১ হাজার ৬৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জমি ও স্থাপনা অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এর অংশ হিসাবে জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত বিভাগ এবং বন বিভাগ যৌথ তদন্ত শেষ করে ৭ ধারার নোটিশ প্রদান করেছে জমি ও স্থাপনার মালিকদের। এছাড়া নড়িয়া উপজেলার নশাসন গাগ্রীজোড়া ও ডগ্রী এলাকাসহ কয়েকটি এলাকায় ৮ ধারার নোটিশ প্রদান করে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন। প্রকল্প স্থাবর ভূমি অধিগ্রহণের আওতাভুক্ত নড়িয়া উপজেলার নশাসন ইউনিয়নের মাঝির হাট এলাকায় বিআরএস ২৩নং নশাসন মৌজার ৬নং খতিয়ানের ৩৩০৩, ৩৩০৪ ও ৩৩০৫ নম্বর দাগে ৩৪ শতাংশ জমি অস্তিত্বহীন এক মাদ্রাসার নামে বিআরএস রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু ও জমি কীভাবে মাদ্রাসার নামে বিআরএস রেকর্ড হয়েছে তারও কোনো দলিলাদি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মাদ্রাসার ওই রেকর্ডীয় সম্পত্তির ৩৩০৫ নম্বর দাগসহ আরও কয়েকটি দাগের সম্পত্তি এসএ রেকর্ড অনুযায়ী পৈতৃক মালিকানা দাবি করে ২০১৯ সালে আব্দুল খালেক ব্যাপারী জেলা প্রশাসক ও অস্তিত্বহীন মাদ্রাসাসহ পাঁচজনকে বিবাদী করে আদালতে মামলা করেন। খালেক ব্যাপারীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী নিলুফা বেগম ওই মামলা পরিচালনা করছেন। জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৮ ধারার নোটিশ দেওয়ার পর মামলার বাদী আব্দুল খালেক ব্যাপারীর স্ত্রী নিলুফা বেগম ৩১ আগস্ট ৩৩০৫ দাগসহ মামলার আরজি অনুযায়ী আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ৫ বিবাদীকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন।

অধিগ্রহণে ৮ ধারার নোটিশে মাদ্রাসার নামে স্থাপনা হিসাবে দেখানো হয়েছে ৩৩০৫ নম্বর দাগের একটি ক্লাব ঘর। কিন্তু ওই ক্লাব ঘরটির নিজস্ব মালিকানা দলিল থাকলেও ক্লাব কর্তৃপক্ষ ৮ ধারার নোটিশ পায়নি। ক্লাব ঘরের দক্ষিণ পাশে রয়েছে আব্দুল খালেক ব্যাপারীর একটি বাগান। তিনিও নোটিশ পাননি। বাগানের পাশেই বাজারের মধ্যে জলিল মাঝির একটি গুদাম ঘর রয়েছে। ওই গুদাম ঘরটিকেও মাদ্রাসার নামে আসা ৮ ধারার নোটিশে দেখানো হয়েছে। আব্দুল জলিল মাঝির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী হয়েছেন স্ত্রী ফেরদৌস জাহান, মেয়ে লায়লা জিয়াসমিন ও বোন জাহানারা বেগম। তারাও নোটিশ পাননি। স্থানীয়দের দাবি নশাসন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল আহসান মাঝি ও গোলাম মোস্তফা মাঝি গুদামঘরসহ ওই ক্লাব ঘরের ভবন দুটিকে মাদ্রাসার ভবন হিসাবে দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সরদার বলেন, ‘বছরখানেক আগে এখানে কয়েকজন ছেলেমেয়েকে পড়তে দেখছিলাম। কিন্তু কোনো মাদ্রাসা ছিল না। মক্তব ছিল। আমরা তো জানি এই জায়গা মৃত খালেক ব্যাপারীর।’ স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মোসলেম ঢালী বলেন, আমার জীবদ্দশায় এখানে কোনো মাদ্রাসা দেখিনি। এখানে মাদ্রাসার নামে বরাদ্দ কীভাবে এলো তা সংশ্লিষ্টরাই ভালো জানেন।

জলিল মাঝির মেয়ে লায়লা জিয়াসমিন বলেন, ‘নশাসন মাঝির হাট বাজারের ওই গুদাম ঘরটির মালিক আমরা। গ্রামে না থাকার কারণে ঘরটি মাদ্রাসার নামে দেখানো হয়েছে। তবে কীভাবে এটা করা হয়েছে তা জানি না।’ মামলার বাদী নিলুফা বেগম বলেন, ৩৩০৫ নম্বর দাগে নশাসন ইবতেদায়ি মাদ্রাসা নামে কোনো ঘর নেই। ওই দাগের জমি আমার স্বামী খালেক ব্যাপারীর নামে। এ নিয়ে এখনো আদালতে মামলা চলমান আছে। যা আমি পরিচালনা করছি। এদিকে ৮ ধারার নোটিশ পাওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন অস্তিত্বহীন ইবতেদায়ি মাদ্রাসা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চুন্নু মাঝি। তিনি বলেন, ‘আমি স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক। গোলাম মোস্তফা মাঝি আমাকে ইবতেদায়ি সাতন্ত্র মাদ্রাসা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করেছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি সভাপতি আর আমি সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া ওই কমিটির অন্য কোনো সদস্য আছে বলে আমার জানা নেই।’ এ ব্যাপারে মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি দাবি করা গোলাম মোস্তফা মাঝি বলেন, ‘আমরা মাদ্রাসার ভবনের ভূমি অধিগ্রহণের ৮ ধারার নোটিশ পেয়েছি। ওই ৩টি দাগের ভূমি আমাদের মাদ্রাসার নামেই। ওই জায়গায় একটি পাকা ঘর আছে সেটিই মাদ্রাসা। ছাত্রছাত্রীরা এখন পড়তে আসে না বলে আমরা ওই পাকা ঘরটি ভাড়া দিয়েছি।’

নশাসন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল আহসান মাঝি বলেন, ‘ক্লাব ঘর ও গুদাম ঘর ভবনের ৮ ধারার নোটিশ মাদ্রাসার নামে হয়েছে। কীভাবে এটা হয়েছে তা মাদ্রসার সভাপতি ভালো বলতে পারবেন। গোলাম মোস্তফা মাঝির সঙ্গে মিলে মাদ্রাসার নামে বরাদ্দকৃত টাকা উত্তোলন বা অধিগ্রহণের সঙ্গে জড়িত কোনো বিষয়ের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ ভিত্তিহীন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুর রহমান পিইঞ্জ বলেন, ‘জমির মালিকানা বা মূল্য নির্ধারণ করেন জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখা। গণপূর্তকে জেলা প্রশাসন থেকে স্থাপনার বর্ণনা দেওয়া হয়। বর্ণনা অনুযায়ী আমরা মূল্য নির্ধারণ করি। প্রত্যেকটি স্থাপনার সরেজমিন তদন্ত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু নব্বই থেকে পঁচানব্বই ভাগ স্থাপনার সরেজমিন তদন্ত করা হয়। জেলা প্রশাসন থেকে যদি কোনো স্থাপনার পুনঃতদন্তের জন্য বলা হয় তাহলে আমরা পুনঃতদন্ত করব।’

এ ব্যাপারে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, মাদ্রাসার যদি কোনো অস্তিত্ব না থাকে, তবে বিল পাবে না। মাদ্রাসার জমি নিয়ে আদালতে মামলা থাকলে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রকৃত মালিককে স্থাপনা ও জমির ন্যায্য মূল্য প্রদান করা হবে।