বুধবার, ২২ মে, ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ১৩ জিলকদ, ১৪৪৫

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, হুমকির মুখে আখ চাষ

কয়েক দশক আগেও শরীয়তপুরের কৃষকরা হেক্টরের পর হেক্টর জমিতে আখের চাষ করতেন। সময়ের বিবর্তনে আখ চাষের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় এই অঞ্চলের চাষিরা আখ চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন। পূর্ব ডামুড্যা এলাকার শাহিন প্রধানের চাষ করা আখ এক সময় রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে বিক্রি হত। চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমানে তিনি মাত্র ১০ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। শাহীন প্রধানের মত জেলার সব এলাকার চাষীদের আগ্রহ কমছে আখ চাষে। যার প্রমাণ মিলেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আখ চাষের লক্ষ্য মাত্রায়।

সম্প্রতি ডামুড্যা বাজারে পাইকারি ও খুচরা আখ বিক্রি করতে দেখা গেছে শাহীন প্রধান ও বাবুল মামুদ, জিল্লু সরদার, সোবাহান মিয়াসহ কয়েকজনকে। এসব বিক্রেতাদের সারা বছরের খরচ চলত আখ চাষ ও বিক্রি করে। কিন্তু এখন বাপ-দাদার কাছে শেখা আখ চাষ পেশাকে ধরে রেখেছেন ছোট পরিসরে।

শাহীন প্রধান, বাবুল মামুদসহ একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পদ্মা ও মেঘনা বেষ্টিত শরীয়তপুর জেলার চরাঞ্চলগুলোতে এক সময় প্রচুর পরিমাণে আখ উৎপাদন হত। এর মধ্যে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা, গুয়াখোলা, মুন্সিরটেক, টেকপাড়, উত্তর ডামুড্যা, রাম রায় কান্দি, গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর, কুচাইপট্টি, নলমুড়ি, নাগেরপাড়া, আলাওলপুর, জাজিরা উপজেলার মাঝিরহাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকা আখ চাষের জন্য বেশ উর্বর ছিল। এই অঞ্চলের আখ ইঞ্জিন চালিত বড় বড় কাঠের ট্রলারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হত।

জেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ চাষি আখ চাষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৪ শতাধিক কৃষক আখ চাষের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। জেলায় চলতি বছর আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫০ হেক্টর জমি। তবে সেখানে ২২০ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে। গত বছর আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২০ হেক্টর জমি। কিন্তু আবাদ হয়েছিল ২৮০ হেক্টর জমিতে। এছাড়াও ফলন হয়েছিল ২৩ হাজার ১৮০ মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে গত ১ বছরে আখের আবাদ কমেছে ৭০ হেক্টর জমিতে।

আখ চাষী শাহীন প্রধান শরীয়তপুর চোখকে বলেন,  প্রায় ৩০ বছর ধরে আখ চাষ করি। এক সময় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জমিতে আখের চাষ করতাম। তখনকার দিনে আখের চাহিদাও ছিল অনেক। আখ জমি থেকেই শরীয়তপুরের গোসাইরহাট, বুড়িরহাট, ভেদরগঞ্জ, বরিশালের মূলাদি ও ঢাকার সদরঘাট অঞ্চলের পাইকাররা কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু এখন আর পাইকাররা জমি থেকে আখ কিনতে আসেন না। এখন আখ বিক্রি করতে হয় ডামুড্যার পাইকারি বাজারে। দিন দিন আখ চাষ ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়ায় এ বছর মাত্র ১০ শতক জমিতে আখ চাষ করেছি।

তিনি আরও বলেন, এক সময় আমাদের উৎপাদন ব্যয় ছিল কম, তাই বেশি জমিতে উৎপাদন করা যেত। দিন দিন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু চাহিদা বাড়েনি। এক সময় প্রতি হাট বারে ৪ হাজার পিচ থেকে ৫ হাজার পিচ আখ বিক্রি করতাম আর এখন ৪০০ পিচ বিক্রি করতেই কষ্ট হয়। এছাড়াও আখ চাষে সরকার থেকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাই না। সরকার থেকে আমাদের আখ চাষিদের জন্য যদি কীটনাশক, সার বিনামূল্যে সরবরাহ করত, তবে আখ চাষীদের আগের মত সুদিন ফিরে আসত।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার শৌলপাড়া এলাকার লাল মিয়া শেখ শরীয়তপুর চোখকে বলেন, আখ চাষ করে নিজের পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয়। এক সময় ৫ বিঘা জমিতে আখ চাষ করতাম। এখন ৪০ শতাংশ জমিতে আখ করি। প্রচুর খরচ আখ চাষে। পাইকাররা আসে না। বাজারে বাজারে নিজের হাতে খুচরা বিক্রি কনতে হয় আখ। ১০ বছর আগেও বাজারে ৫০ জনের বেশি পাইকার আসত। এখন ৫ জন পাইকার আসলে আমার মত চাষির মুখে আনন্দ ফুটে।

গোসাইরহাট এলাকার আখ চাষি মোশারফ হোসেন শরীয়তপুর চোখকে বলেন, আমার নিজের জমি না থাকায় ১০ বছর ধরে অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করি। যা আখ হয় তার ৩ ভাগের ১ ভাগ আমি পাই। আখ চাষে খরচ বাড়ার কারণে আমাদেরও বেশি দামে আখ বিক্রি করতে হয়। তাই লোকজন আগের মত আখ কিনে না। শুনেছি চিনিকলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চিকিকল বন্ধ হলে আখ চাষিদের এ পেশা ছেড়ে অন্য কিছু করতে হবে।

পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম হাওলাদার  বলেন, ১৫ বছর আগে ডামুড্যা বাজারে আমার মত ৫০ জন পাইকারি ব্যবসায়ী ছিল। এখন মাত্র ১০ জন আখ ব্যবসায়ী টিকে আছি। আগে ১ দিনে ২ লাখ টাকার আখ বিক্রি হতো। আর এখন ৫০ হাজার টাকাই বিক্রি হয় না। গত বছর আমি প্রতিদিন ৫০০ পিচ মাল বিক্রি করেছি। এ বছর ২৫০ পিচ মাল বিক্রি করতেই কষ্ট। সারাদিন আখ বিক্রি করে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা লাভ হয়।

শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. রবীআহ নূর আহমেদ বলেন, আখ ফসলটি মূলত শিল্প মন্ত্রণালয় তদারকি করে থাকেন, এটা কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত নয়। তাছাড়া যে-সব অঞ্চলে চিনি কল রয়েছে সেসব অঞ্চলের আওতাভুক্ত আখ চাষীদের সরকারিভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করে থাকেন। আমাদের এই অঞ্চল চিনি কলের আওতাভুক্ত না হওয়ার কারণে আখ চাষিদের জন্য সরকারিভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। তবে তারা যেহেতু আমাদেরই কৃষক, আখ চাষের বিষয়ে কোনো পরামর্শ চাইলে আমাদের পক্ষ থেকে তাদের পরামর্শ দেয়া হবে।