বুধবার, ২২ মে, ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ১৩ জিলকদ, ১৪৪৫

শঙ্কার মধ্যেই ভোটের বাদ্য বাজল

জানুয়ারি ভোটের দিন রেখে দেশের ইতিহাসে প্রথম সিইসি হিসেবে সরাসরি সম্প্রচারে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তফসিল ঘোষণা করেন কাজী হাবিবুল আউয়াল।

এক দশক আগের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে, ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর অবরোধ আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আনন্দ মিছিলের মধ্যে ‘ভোটের ট্রেন’ ছেড়ে দিল নির্বাচন কমিশন; দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণের ঘোষণা এল।

দেশের ইতিহাসে প্রথম সিইসি হিসেবে সরাসরি সম্প্রচারে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে কাজী হাবিবুল আউয়াল জানালেন, নতুন বছরের শুরুতেই- ৭ জানুয়ারি দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটের আয়োজন হবে।

তবে নির্বাচন প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে যে ‘রাজনৈতিক মতভেদ’ আছে, সে কথা তিনি নিজেও স্বীকার করে নিলেন। মতভেদ থেকে সংঘাত ও সহিংতা হলে তা থেকে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ‘বিরূপ প্রভাব’ বিস্তার করতে পারে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন।

সেজন্য সংলাপের আহ্বান জানিয়ে হাবিবুল আউয়াল বললেন, “মতৈক্য ও সমাধান প্রয়োজন। আমি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, সংঘাত ও সহিংসতা পরিহার করে সদয় হয়ে সমাধান অন্বেষণ করতে।”

তফসিল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষকদের কাছে অনেকটা অনুমিতই ছিল। আগের ঘোষণা অনুযায়ী তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে দেশজুড়ে আনন্দ মিছিল করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে বিএনপি এ তফসিলকে ‘একতরফা’ আখ্যায়িত করে বলছে, এ তফসিলে দেশে ‘কোনো দিন নির্বাচন হবে না’। সমমনা জোট ও দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও একই।

সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সারা দেশে অবরোধের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার অবস্থানে অনড়।

নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বুধবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।

তফসিলের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দেশে অর্ধদিবস হরতালের ডাক দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ হরতাল হবে। এর আগেই বুধবার সন্ধ্যার পর কয়েক জেলায় সংঘাতের খবর এসেছে।

ভোট বর্জনের ঘোষণা, হরতাল-অবরোধ আর সমঝোতার প্রশ্নে অনমনীয় মনোভাব জনমনে ফিরিয়ে আনছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্মৃতি; নানান শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে।

২০১৪ সালে সেই নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে নির্বাচনে জিতে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ভোটের ফলে তাদের ভরাডুবি হয়। ‘আগের রাতে’ ভোট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে ফল প্রত্যাখ্যান করে দলটি।

এবার ২০১৪ সালের মত একই দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। বিএনপির ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে সহিংসতা। তাতে অনেকেরই প্রাণ গেছে। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ আর নাশকতার খবর আসছে প্রতিদিন।

এমন প্রেক্ষাপটে তফসিল ঘোষণার দিন দুই আগে যুক্তরাষ্ট্র দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিঃশর্ত সংলাপের আহ্বান জানালেও বিবাদমান পক্ষগুলো তাতে সাড়া দেয়নি। বিএনপি এ সংলাপে কোনো ফায়দা দেখছে না। আওয়ামী লীগ বলেছে, এখন আর সংলাপের ‘সময় নেই’।

বিপরীতমুখী রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে ভোটারদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে, না কি ২০১৪ সালের মত বর্জন করে তা প্রতিহত করার চেষ্টা চালাবে?

জনমনে সেই শঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, “হয়ত এখন যে পরিস্থিতি রয়েছে, সেই পরিস্থিতিতেই নির্বাচন হবে। তফসিল পরে দিলেও একই অবস্থা হত। জনগণের মাঝে এ নিয়ে ভয়-ভীতি আছে।”

সংলাপের মানসিকতা কারও মধ্যে না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সংলাপ তো কেউ-ই করতে চাচ্ছে না। সংলাপ কোনো পক্ষই চাচ্ছে না।

“আমার দাবি মানতে হবে- তাহলে সংলাপ হবে, এভাবে তো হয় না। কীভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যায়, সেটা চিন্তা করেই তো সংলাপ। কিন্তু শর্ত জুড়ে দিলে তো সংলাপ হবে না।”

সমঝোতার আহ্বান সিইসির

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমাতে সমঝোতার পথে আসা, সবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সংলাপ, নির্বিঘ্নে জনগণকে ভোট দিতে আসার আহ্বানও ছিল সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের তফসিল ঘোষণার বক্তব্যজুড়ে।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত, তা বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। এর তিন সপ্তাহ পর হবে ভোটগ্রহণ।

জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকা রাজনৈতিকগুলোকে সংলাপে বসে সমাধান খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন সিইসি।

তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে সকল দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সর্বদা স্বাগত জানাবে। পারস্পরিক প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা পরিহার করে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা ও সমাধান অসাধ্য নয়।”

নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বুধবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।

নির্বাচন কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নে রাজনৈতিক মতভেদ থাকার কথা তুলে ধরেই তিনি বলেন, “অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য কাঙ্ক্ষিত অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন প্রশ্নে, বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির প্রশ্নে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বে মতভেদ পরিলক্ষিত হচ্ছে।”

সিইসি বলেন, “বহুদলীয় রাজনীতিতে মতাদর্শগত বিভাজন থাকতেই পারে। কিন্তু মতভেদ থেকে সংঘাত ও সহিংতা হলে তা থেকে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

“মতৈক্য ও সমাধান প্রয়োজন। আমি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, সংঘাত ও সহিংসতা পরিহার করে সদয় হয়ে সমাধান অন্বেষণ করতে।”

নিজেরা চেষ্টা করেও বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে আলোচনার টেবিলে আনতে না পারার ব্যর্থতার কথাও ভাষণে স্মরণ করেন সিইসি।

তিনি বলেন, “আগ্রহী সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ, সিনিয়র সাংবাদিক এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে একাধিকবার সংলাপ ও মতবিনিময় করেছি। তাদের মতামত শুনেছি। সুপারিশ জেনেছি। আমাদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছি।

“নিবন্ধিত অনাগ্রহী সকল রাজনৈতিক দলকেও একাধিকবার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তারা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।”

রাজনৈতিক দলগুলোকে তিনি মনে করিয়ে দেন, “পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক ‍আস্থা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা টেকসই ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যকীয় নিয়ামক।”

জনগণকে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাবিবুল আউয়াল বলেন, “জনগণকে অনুরোধ করব, সকল উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি পরাভূত করে নির্ভয়ে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে এসে অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে।”

তিনি বলেন, “ভোট আপনার । ভোট প্রদানে কারও হস্তক্ষেপ বা প্ররোচনায় প্রভাবিত হবেন না। কোনো রকম হস্তক্ষেপ বা বাধার সম্মুখীন হলে একক বা সামষ্টিকভাবে তা প্রতিহত করবেন।”

আওয়ামী লীগ ও সমমনাদের ‘স্বাগত’

সিইসির ঘোষণার পরপরই জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে আওয়ামী লীগ ও এর সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিলও করেছে ক্ষমতাসীন দল এবং এর অঙ্গ সংগঠনগুলো।

ক্ষমতাসীন দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ট্রেন কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়ে বিএনপির ভোট বর্জনের ঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তারা ‘নির্বাচনী ট্রেনে’ না উঠলে কিছু করার নেই।

গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের অংশ হিসেবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “গণতন্ত্র রক্ষাকারী বাঙালির জন্য আজকের দিনটি খুব আনন্দের একটি ঐতিহাসিক দিন।”

আগামী শুক্রবার দলের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “মনোনয়নপত্র ফরম বিক্রি হবে একই সময়ে।”

তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকায় মিছিল করেছে আওয়ামী লীগে জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদও।

এক বিবৃতিতে দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, “নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান সমুন্নত থাকলো, সংবিধানের প্রাধান্য সংরক্ষিত হলো, নির্বাচন বিরোধী দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা ও সন্ত্রাসবাদী শক্তি পরাজিত হলো।”

তফসিল প্রত্যাখ্যান বিএনপি ও সমমনাদের

বিএনপি এবং তাদের সঙ্গে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর অবরোধের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছেন সিইসি।

ঢাকায় কোনো বিক্ষোভ দেখাতে না পারলেও তফসিল প্রত্যাখ্যান করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।

জাতীয় নির্বাচনের তফসিলকে ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে তা ‘ঘৃণাভরে’ প্রত্যাখান করার কথা জানিয়ে সন্ধ্যায় ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

সিইসি গোটা জাতির সঙ্গে ‘ইয়ার্কি করেছেন’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘গোটা বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর্যপুরি আহ্বান উপেক্ষা করে ‘নিশিরাতের সরকারের তল্পিবাহক’ নির্বাচন কমিশন ‘একতরফা’ নির্বাচনের ‘তামাশার তফসিল’ ঘোষণা করেছে।

“শেখ হাসিনার নির্দেশে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের জন্য ‘মেরুদণ্ডহীন ও পক্ষপাতদুষ্ট’ নির্বাচন কমিশন যে তফসিল ঘোষণা করেছে তা আমরা চরম ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করছি।”

গত ২৯ অক্টোবর হরতালের পর এক দিন বাদ দিয়ে টানা কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। দুটি কর্মদিবস বাদ দিয়ে প্রতি কর্মদিবসেই অবরোধ চালিয়ে আসছে দলটি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির পঞ্চম দফা অবরোধের প্রথম দিন বুধবার সকালে রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে বিএনপির মিছিল।

এ তফসিল ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় দেশে যে ‘ভয়াবহ অচলাবস্থা’ ও ‘চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা’ তৈরি হবে তার পুরো দায়ভার সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই বহন করতে হবে বলেও ঘোষণা দেন এই বিএনপি নেতা।

সিইসি ‘অবাধ, সুষ্ঠু’ নির্বাচনের যে প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন, তাকে ‘হাস্যকর’ মন্তব্য করে রিজভী বলেন, ‘‘এই সরকার থাকবে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে… প্রধান নির্বাচন কমিশনার সারা জাতির সঙ্গে মশকরা করেছেন।”

পরপর তিনটি নির্বাচনে ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ এনে বিএনপি নেতা বলেন, “অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলে রেখে আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছর দেশকে নরকপুরীতে ও জনগণের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে।”

তার দাবি জনগণ ১৫ বছরের অত্যাচারের জবাব দিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

তফসিল প্রত্যাখ্যান করে বৃহস্পতিবার দেশে অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির।

সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ‘ঠেকাতে’ বুধবার নির্বাচন কমিশন অভিমুখে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিছিলটি শান্তিনগরে আটকে দেয় পুলিশ।

রাজনৈতিক সমঝোতার আগে তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে বুধবার বিকালে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে মিছিল নিয়ে রওনা করেছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম থেকে বের হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় দিয়ে কাকরাইল হয়ে শান্তিনগরে চৌরাস্তায় গিয়ে পৌঁছালে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।

জাতীয় পার্টির দুই বক্তব্য

তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির কো চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ।

বুধবার রাতে বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তিনি আশা করেন, কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে।

তবে দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, তারা তিনশ আসনেই ভোট করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। যদি তারা মনে করেন জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, তাহলেই ভোটে আসবেন। ভোটে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কয়েক দিনের মধ্যেই নেওয়া হবে।

‘অগ্নিপরীক্ষা’ আওয়ামী লীগ-বিএনপির, সমঝোতা কি হবে?

নির্বাচনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির’ প্রশ্নে বিরোধ মেটাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপের আহ্বান সিইসি জানালেও তা হবে কি না, সেটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, যখন কারও আন্দোলনের দফা একটি হয়, তখন সংলাপের কিছু থাকে না, তখন লাগে গণঅভ্যুত্থান।

“সেটা বিএনপি করতে পারেনি। এখন যেটা দেখার বিষয়, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, না নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে। যেহেতু, তার এক দফার আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে, সেহেতু অংশগ্রহণ করতে বাধ্য। অতএব, বিএনপির উচিত হবে নির্বাচনে আসা।”

এবারের নির্বাচনকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “বিএনপির জন্য অগ্নিপরীক্ষা হল-তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বর্জন করবে, না প্রতিহত করতে যাবে।

“সরকারের জন্য হল-এবারকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়েছে, জনগণের মতামতের প্রকাশ ঘটেছে- এটা যাতে ঘটে, তা নিশ্চিত করা হল সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। কাজে, উভয়ের জন্য পরীক্ষার বিষয় আছে এখানে।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদের মনে হচ্ছে, ‘এই সংকট থাকবেই’।

অনেক বিরোধী দলের তফসিল প্রত্যাখ্যানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তার মানে তারা নির্বাচনে অংশ নিবে না। তাহলে ভাবতে হবে, তারা কোন পথে হাঁটতে চায়। তারা যদি নির্বাচনের পথে হাঁটতে না চায়, তাহলে তারা কী হরতাল-অবরোধের পথে হাঁটবে কি না। রাস্তাঘাটে সহিংসতা বাড়বে কি না, মানুষের রুজি-রোজগার ব্যাহত হবে কি না সেটা মানুষকে শঙ্কায় ফেলেছে।”

তিনি বলেন, “বর্তমান শাসক দলকে এটি মোকাবেলা করতে হবে। সহিংসতা হবে, বাস পোড়ানো হবে। হরতাল-অবরোধ হবে। এর ভেতরই নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনের ফলে কিছু জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হবে।”

তবে সংলাপকে এখনও অসম্ভব মানছেন না জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ-জানিপপ এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।

তিনি বলেন, “এখনও সংলাপ হতে পারে। মনোনয়ন জমাদানের আগের দিন পর্যন্ত সংলাপ হতে পারে।”

এই বিশ্লেষক বলেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার যে সন্দেহটা প্রকাশ করছিলেন, আকাঙ্খাগুলো ব্যক্ত করছিলেন, তার প্রতিফলন আছে তার ভাষণে। আবার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা যে রয়েছে, না করেও উপায় নেই, সেটাও বলেছেন।