বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩১, ১১ মহর্‌রম, ১৪৪৬

ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়া নিয়ে ভাগ্নেদের বিক্রি করে দেন মামা

 

হাবিবুর রহমান বেপারী দীর্ঘদিন লিবিয়াতে ছিলেন। নিজে ইতালি প্রবেশ করতে না পারলেও দেশে ফিরে নিজের দুই সন্তানকে ইতালিতে পাঠান তিনি। মামাতো ভাইদের এমন সাফল্যে মামা হাবিবুর রহমানের হাত ধরে অবৈধপথে ইতালি যাত্রা করেছিল আল আমিন, রাকিব ও ফেরদৌস। তবে তারা কেউই ইতালি পৌঁছাতে পারেনি। মামা ও তার সঙ্গীরা মিলে মাফিয়াদের কাছে তাদেরকে বিক্রি করে দেন।

পরে ১০ মাসের বেশি সময় ধরে ছোট্ট একটি রুমের মধ্যে সহ্য করতে হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতন থেকে বাঁচতে ৩৩ লাখ টাকা ও জমির দলিল করে দিতে হয়েছে মামাকে। টাকা ও জমি বুঝে পাওয়ার পর মামা হাবিবুর রহমান বেপারী ও মাফিয়া তুহিন শেখ তাদেরকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে দেন। এরপর সরকারের সহায়তায় দেশে ফিরে এখন হাসপাতালে ভর্তি আছেন তারা।

শনিবার (২ ডিসেম্বর) সকালে লিবিয়াতে মাফিয়া তুহিন শেখের নির্যাতনের শিকার আল আমিন, রাকিব খান ও ফেরদৌস শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের উত্তর ভাষানচর গ্রামের এনামুল মাদবরের ছেলে ফেরদৌস মাদবর (২০) গত ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশে ফিরেছেন। একই গ্রামের খলিল ফকিরের ছেলে আল আমিন (২১) ও নড়িয়া পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাদশাহ খানের ছেলে রাকিব খান (২২)। গত ২৯ নভেম্বর দেশে ফিরেছেন তারা। সারা শরীরে জখম ও ব্যথা নিয়ে দেশে ফিরে তারা সবাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে আল আমিন ও রাকিব খান হাবিবুর রহমান বেপারীর আপন ভাগনে ও ফেরদৌস আহম্মেদ আপন মামাতো ভাই।

জানা গেছে, উত্তর ভাষানচর গ্রামের হাবিবুর রহমান বেপারী দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। তিনি তার দুই ছেলেকে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পাঠিয়েছেন। আপন মামা ও ফুফাত ভাইকে বিশ্বাস করে ১১ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার জন্য চুক্তি করেন তারা। কথা অনুযায়ী প্রথমে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নেয় হাবিবুর। বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর ও দুবাই হয়ে লিবিয়া প্রবেশ করার পর চুক্তি অনুযায়ী আরও সাড়ে ৬ লাখ টাকা নেয় হাবিবুর রহমান। এরপর তিনি আল আমিন, রাকিব ও ফেরদৌসকে মকবুল ও মকুলের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে মকবুল ও মকুল তাদেরকে বিক্রি করে দেয় তুহিনের কাছে। তুহিন তাদেরকে একটি বদ্ধ করে আটক করে লোহার সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে ভিডিও পাঠায় পরিবারের কাছে।

নির্যাতন থেকে বাঁচাতে ও ইতালি পৌঁছে দিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন মাফিয়া তুহিন। এই টাকা মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানার কবিরাজপুর সংকরদি এলাকার মনিরার কাছে টাকা পৌঁছে দিতে বলেন তুহিন। টাকা না দিয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবার মনিরাকে র‌্যাবের কাছে ধরিয়ে দিলে লিবিয়াতে তিন জনের ওপরই অতিরিক্ত মাত্রায় নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রত্যেককে দিতে হয় ১১ লাখ করে টাকা। টাকা দিয়েও নির্যাতন থেকে মুক্তি না মেলায় ছাড়তে হয় মনিরাকে। এরপরও তাদেরকে বন্দি করে রাখা হলে মুক্তি দেওয়া ও ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন হাবিবুর রহমান বেপারী। বিনিময়ে রাকিবের মা কমলা বেগম ও আল আমিনের মা মঞ্জিরা বেগমকে হাবিবুর বেপারী ও তার ভাই মজিবুর বেপারীর নামে ২০ শতাংশ জমি লিখে দিতে হয়। এত কিছু দিয়েও মুক্তি মেলেনি কারও। সারাদিনে এক টুকরো রুটি খেয়ে নির্যাতন সহ্য করতে হয় ১০ মাস। শত নির্যাতন করেও আর কোনো টাকা না পেয়ে গত দুই মাস আগে লিবিয়ার পুলিশের কাছে আল আমিন, রাকিব ও ফেরদৌসকে তুলে দেয় তুহিন। দুই মাস জেলে বন্দি থাকার পর সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন তারা।

ভুক্তভোগীরা বলেন, আমাদের পুরো শরীর ব্যথায় জর্জরিত। আটক করার পর পরই শুরু হয় মারধর। একটানা দিনের পর দিন লোহার এঙ্গেলের সঙ্গে পা উপরের দিকে দিয়ে ঝুলিয়ে আমাদেরকে পেটানো হত। মাটিতে শুইয়ে দিয়ে পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত প্রতিটি পয়েন্টে নির্যাতন করা হয়েছে। পানি চাইলে পানি খেতে দিতো না। সারাদিনে রুটির মত এক টুকরো খাবার দিতো। এই সময়ে ভাত জাতীয় কিছুই খেতে দেওয়া হয়নি। নির্যাতন শুরু করার এক মাসের মধ্যে ১১ লাখ টাকা দিয়ে মারধর থেকে মুক্তি পেলেও ওই রুম থেকে বের হতে দেয়নি। চিকিৎসাও করায়নি। তাই ব্যথা শরীরে গেঁথে আছে। মাফিয়া তুহিন ভেবেছিল সুস্থ হলে আবার মারধর করে টাকা নিবে। কিন্তু সুস্থ হইনি বলে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিয়েছে আমাদের। সেখান থেকে পুলিশ দেশে পাঠিয়েছে। নইলে প্রাণে বাঁচতাম না।

রাকিবের মা কমলা বেগম বলেন, লিবিয়া নিয়ে ছেলেদের আটক করে উত্তারাধীকার সূত্রে পাওয়া জমি লিখে নিয়েছে আমার ভাই হাবিবুর রহমান ও মজিবুর রহমান বেপারী। ভাই হয়ে কীভাবে ভাগ্নেদের এমন নির্যাতন করে টাকা পয়সা নিল। আমি এর বিচার চাই।

ফেরদৌসের মা আসমা বেগম বলেন, আমার ছেলেটার বয়স মাত্র কুড়ি। হাবিবুর বেপারী ফেরদৌসকে ইতালি পাঠাবে বলে নিয়ে গিয়েছিল। আমার ছেলের অবস্থা খুবই খারাপ। জায়গা জমি বিক্রি করে ছেলেকে প্রাণে ফিরে পেয়েছি। এখন ভালো চিকিৎসা করানোর টাকাও নেই আমাদের। হাবিবুর, মকুল, মনিরা, তুহিনের বিচার চাই আমি।

উল্লেখ্য, উত্তর ভাষানচর গ্রামের বেলায়েত সরদারের ছেলে আরিফ সরদার ও মো. রাকিব সরদারের ভাই রাজিব সরদারকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে হাবিবুর রহমান বেপারী লিবিয়াতে তাদেরকে আটক করে ৩৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়েছে। এরপরও তাদেরকে মুক্তি না দেওয়ায় অন্য দালালের সহযোগিতায় আরিফ সরদার ও রাজিব সরদারকে ইতালিতে পাঠিয়েছে তাদের পরিবার। বেলায়েত সরদার ও রাকিব সরদারের ভাষ্যমতে হাবিবুর রহমানের কাজই লোভ লালসা দেখিয়ে দেশ থেকে যুবকদের লিবিয়া নিয়ে যাওয়া। সেখানে নিয়ে আটক করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার পেশা। উত্তর ভাষানচর এলাকা থেকেই ১০ জনের বেশি যুবক লিবিয়াতে নিয়ে একই কাজ করেছেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে জানার জন্য হাবিবুর রহমান বেপারীর বাড়ি গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী আঞ্জুবান বেগম ও ছেলে শরীফ বেপারী বলেন, হাবিবুর রহমান বেপারী প্রায় ৬ বছর লিবিয়াতে ছিলেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও ইতালি পৌঁছাতে পারেননি। তারপর তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। দেশে আসার পর লিবিয়াতে পরিচয় হওয়া এক ব্যক্তি তাকে লোক পাঠাতে বলেন। ওই ব্যক্তির কথা অনুযায়ী হাবিব বেপারী তার দুই ছেলে সলেমান ও আরিফকে লিবিয়া থেকে ইতালি পাঠিয়েছে। তারা ইতালিতে ভালোই আছেন। এরপর তার দুই ভাগ্নে আল আমিন ও রাকিব এবং মামাতো ভাই ফেরদৌসকে লিবিয়া থেকে ইতালি পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের পরিবার, দালালকে র‍্যাবের কাছে ধরিয়ে দেওয়ায় তাদেরকে ইতালি পাঠানো যায়নি। তিনি কাউকে আটক করে টাকা আদায় করেননি।

সন্তোজপুর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম বলেন, লিবিয়াতে লোক নিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় মামলা চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগীরা আদালতে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন।