শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১০ ফাল্গুন, ১৪৩০, ১২ শাবান, ১৪৪৫

অন্ধ ভাইবোনের চোখের জ্যোতি সোনিয়া

বাবা ক্ষেতমজুর, ছোট দুই ভাইবোন জন্ম থেকেই অন্ধ। তাই অভাবের সংসারে একদিকে ফসলের ক্ষেতে কাজ করতে হয় অন্যদিকে দেখাশোনা করতে হয় ছোট ভাইবোনদের। পরিবারের এমন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে সোনিয়ার। কাজ না পেলে অনেক সময় তাদের বাসার চুলা জ্বলে না। অর্থের অভাবে অন্ধ দুই সন্তানের চিকিৎসাও করাতে পারছেন না বাবা বোরহান উদ্দিন মৃধা।

বোরহান উদ্দিন মৃধার পরিবারের সব সদস্যরাই যেন এক একটি দুঃখের নাম। এই পরিবারটির বসবাস শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার চরসেনসাস ইউনিয়নের নরসিংহপুর চোকদার কান্দি গ্রামে।

জানা যায়, অন্যের বাড়িতে দিন মজুরের কাজ করেন বোরহান উদ্দিন। বড় দুই মেয়ে খাদিজা ও সোনিয়া সুস্থ স্বাভাবিক হলেও ছোট দুই সন্তান সিয়াম হোসেন ও রুনিয়া জন্ম থেকেই অন্ধ। উপজেলা সদরের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করলে চোখে দেখতে পাবে শিশু দুইটি। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই সামর্থ্য নেই তার। বড় মেয়ে খাদিজার বিয়ের পর ছোট দুই ভাইবোনের দেখাশোনা করতে হয় সোনিয়ার (১৩)। বোরহান মৃধা অন্যের ফসলি জমিতে কাজ করে যে আয় করেন, তা দিয়ে বর্তমান তাদের জীবন চলা খুব কষ্ট হয়। তাই সোনিয়ার মা ফাতেমা বেগমও স্বামীকে সহায়তা করেন।

খোরশেদা বেগম নামে এক গৃহবধূ বলেন, সিয়াম ও রুনিয়া অন্ধ বলে তাদের মা-বাবা কোনোদিকে যেতে পারে না। বড় মেয়ে ছোট দুই ভাইবোনের দেখাশোনা করেন। ফাতেমা বেগম যদি বাচ্চা দুইটি নিয়ে বাড়িতে বসে থাকেন তাহলে পরিবারটির খাবার জুটে না। প্রধানমন্ত্রীসহ আমাদের মন্ত্রী মহোদয় যদি বাচ্চা দুইটির চিকিৎসা করে দিত তাহলে পরিবারটি ভালোভাবে বাঁচতে পারত।

সিয়াম ও রুনিয়ার সম্পর্কে দাদি হয় বেলাতন নামে আরেক গৃহবধূ। তিনি বলেন, সোনিয়া আমার নাতি নাতনি নিয়ে যে কষ্ট করে তা বলার মতো নয়। ওদের বাবা-মা কাজ করে বলে সিয়াম ও রুনিয়ার দেখাশোনা করতে পারে না। সোনিয়া লেখাপড়া করতে চায় কিন্তু সিয়াম ও রুনিয়ার দেখাশোনা করতে হয় বলে স্কুলে যেতে পারে না। কষ্ট আর অভাবে দিন যায় এই পরিবারটির।

সোনিয়া বলে, ভাই বোনদের দেখাশোনা করতে হয় বলে আমি পড়াশোনা করতে পারি না। বাবা-মা কাজ করেন, আমি ভাইবোনদের দেখাশোনা করি। আমার পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও আমি স্কুলে যেতে পারি না। ওদেরকে খাওয়ানো, পড়ানো, গোসলসহ সব কিছুই আমার করতে হয়।

শিশুদের মা ফাতেমা বেগম বলেন, ডাক্তার বলেছিল চিকিৎসা করলে আমার সন্তানরা ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু টাকা পয়সার জন্য চিকিৎসা করাতে পারি না। বড় মেয়ে খাদিজাকে বিয়ে দেওয়ার পর সোনিয়া সিয়াম ও রুনিয়ার দেখাশোনা করে। স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। যদি প্রধানমন্ত্রীসহ সমাজের বিত্তবান কেউ আমার সন্তানদের চোখের চিকিৎসা করার ব্যবস্থা করে দিতেন তাহলে ওরা দুনিয়া দেখতে পারত। ভবিষ্যতে চলাফেরা করে খেতে পারত।

বোরহান উদ্দিন মৃধা বলেন, আমার জায়গা জমি নেই। আমি অন্যের ফসলি জমিতে কাজ করে জীবনযাপন করি। আমার সামর্থ্য নেই সিয়াম ও রুনিয়ার চিকিৎসা করানোর। কেউ যদি আমার বাচ্চাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে তাদের জন্য আমি বুক ভরে দোয়া করতাম। যারা আমার বাচ্চাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিবেন তাদেরকে দোয়া করা ছাড়া আমার দেওয়ার মতো আর কিছু নেই।

চরসেনসাস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার ইউনিয়নের একই পরিবারের দুইটি বাচ্চা জন্ম থেকে চোখে দেখে না। এর মধ্যে একজনের প্রতিবন্ধী কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে পরিষদ থেকে। আমি জানতে পেরেছি চিকিৎসা পেলে বাচ্চা দুইটি চোখে দেখতে পারবে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমি সমাজসেবা কর্মকর্তা ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো।

শরীয়তপুর জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ বৈদ্য বলেন, একই পরিবারের বাচ্চা দুইটি যদি চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে তাদের পাশে থাকব। পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনে ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করব। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে তারা সুস্থ হবেন বলে আমার প্রত্যাশা।