শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১০ ফাল্গুন, ১৪৩০, ১২ শাবান, ১৪৪৫

৩০০ টাকায় ‘হেলিকপ্টার’ !

ইলিশ মাছের মাথাবিহীন লেজ ভাজা। লেজ দুই দিকে ছড়ানো– দেখতে নাকি হেলিকপ্টারের মতো, তাই দোকানি খাবারটির নাম দিয়েছেন ‘হেলিকপ্টার’

ভাঙাচোরা একটি খাবারের হোটেল। নেই সাইনবোর্ড। হোটেলটির সামনে দাঁড়ালে শোনা যায়, হাঁক–ডাকে মাত্র ৩০০ টাকায় ‘হেলিকপ্টার’ বিক্রি করছেন দোকানি। প্রশ্ন আসতেই পারে, এই দামে আবার কেমন ‘হেলিকপ্টার’? আদতে এই ‘হেলিকপ্টার’গুলো কোনো প্লাস্টিক কিংবা ধাতুর নয়। এটি বিশেষভাবে তৈরি, ইলিশ মাছের মাথাবিহীন লেজ ভাজা। লেজ দুই দিকে ছড়ানো– দেখতে নাকি হেলিকপ্টারের মতো, তাই দোকানি খাবারটির নাম দিয়েছেন ‘হেলিকপ্টার’।

বিশেষ এই ‘হেলিকপ্টার’টি খেতে হলে আপনাদের যেতে হবে শরীয়তপুরের নড়িয়া বাজারের সালাম খাঁনের হোটেলে। অনেকে আবার এই হোটেলকে সুরত খাঁনের হোটেল নামেও ডেকে থাকেন।

দোকানের মালিক সালাম খাঁনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই হোটেলটি অন্তত ১২৬ বছরের পুরনো। সালাম খাঁনের বাবা সুরত খাঁন প্রথম এই হোটেলটি দিয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘ ৭০ বছর হোটেলটি পরিচালনা করেছেন। সুরত খাঁনের মৃত্যুর পর তার ছেলে সালাম খাঁন বর্তমানে ৫৬ বছর ধরে হোটেলটি পরিচালনা করে আসছেন৷

হোটেলটিতে বর্তমানে ৭ জন কর্মচারী কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে নদীর বিভিন্ন মাছ, দেশি মুরগি আর খাসির মাংস বিক্রি করে ভোজনরসিকদের মন জয় করে আসছে সালাম খানের হোটেলটি। মাটির চুলায় আর শীল পাটায় রান্না করায় এখানের খাবারের মানও থাকে অটুট। এখানের জনপ্রিয় ‘হেলিকপ্টার’ তৈরির মূল কারিগর সালাম খাঁনের বাবা সুরত খাঁন হলেও, ‘হেলিকপ্টার’ নাম দিয়েছেন সালাম খাঁন নিজেই।

হোটেল মালিক সালাম খাঁন জানান, অনেকেই কাটার জন্য ইলিশ মাছের লেজ পছন্দ করেন না। তাই লেজটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে কোনো কাটা থাকবে না। প্রথমে বাজার থেকে পদ্মার ইলিশ মাছ কিনে মাছের লেজটিকে সাইজ করে কেটে বটির সাহায্যে উপরের দিকে থেকে ভেতরের কাটাগুলোকে ভালোভাবে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। লেজটিকে এমনভাবে কাটতে হয় যাতে ভেতরের কাটাগুলো সম্পূর্ণ ছোট ছোট হয়ে মাছের লেজের সঙ্গেই মিশে যায়। এরপর এটিকে কড়াইয়ে ফুটন্ত ডুবো তেলে ভাজা হয়। ব্যাস এ থেকেই হয়ে যায় ‘হেলিকপ্টার’। যা মুখে দিলেও কাটা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সালাম খাঁন আরও জানান, আমাদের এই হোটেলটি অনেক পুরাতন। বাবার পরে আমি এখন চালাই। আমার এখানে প্রতিটি খাবার মাটির চুলা আর শীল পাটায় মসলা বেটে রান্না করা হয়। নদীর টাটকা মাছ আর দেশি মুরগি ও খাসি রান্না করা হয়। এছাড়া বিশেষ চাহিদা ‘হেলিকপ্টার’ তো আছেই। যারা একবার ‘হেলিকপ্টার’ খেয়েছে তারা পরের বার আসলে এই ‘হেলিকপ্টার’ খাবেই। আমি সব সময় আমার হোটেলের সকল খাবারে বাড়ির তৈরি খাবারের স্বাদ ধরে রাখার চেষ্টা করি। এখানে খাবার পরিবেশনের সময় সালাদ দেওয়া হয় না। আমার বাবা দেয়নি তাই আমিও দেই না।

ভোজেশ্বর এলাকার জয়নাল আবেদিন গোরাপী (৫৫) বলেন, ‘‘দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই হোটেলে খাওয়া–দাওয়া করি। আমি যখন নড়িয়াতে আসি এই সালাম খানের দোকানে দুপুরের খাবার খাই। তার যে ইলিশ মাছের লেজের ‘হেলিকপ্টার’ এটি তার বাবার আমল থেকেই চলে আসছে। তবে ‘হেলিকপ্টার’ নামটি সালাম খান দিয়েছেন। কাটা ছাড়া লেজ খেতে সত্যিই দারুণ লাগে।’’

রনি হাওলাদার নামের এক ভোজনরসিক বলেন, ‘‘আমি দীর্ঘদিন ধরে সালাম কাকার হোটেলের খাবার খাই। তার হোটেলে তৈরি প্রতিটি খাবার ভীষণ সুস্বাদু একদম বাড়ির তৈরি খাবারের মতো। তার হোটেলের স্পেশাল জিনিসটি হচ্ছে ‘হেলিকপ্টার’। অনেকে কাটার ভয়ে ইলিশ মাছের লেজ খায় না। কিন্তু সালাম কাকার হোটেলে ইলিশ মাছের লেজ থেকে কাটা সরিয়ে ভিন্নভাবে তৈরি করা হয়। খেতেও খুব দারুণ।’’

মোহাম্মদ সবুজ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘‘প্রথমে আমি যখন খাবার খেতে এই হোটেলে আসি, তখন এসে ‘হেলিকপ্টার’ এর কথা শুনি। একপ্রকার কৌতূহলের বশে খাবারটি চাই। পরে দেখি ইলিশ মাছের লেজ। তবে মুখে দিয়ে দেখি কোনো কাটা নেই, খেতেও বেশ ভালো লেগেছিল। এরপর বেশ কয়েকবার আমি এই ‘হেলিকপ্টার’ খেয়েছিলাম।’’

নড়িয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র শহিদুল ইসলাম বাবু রাড়ী বলেন, ‘হোটেলটি অনেক পুরনো, দেখলে কারো পছন্দ হবে না। কিন্তু এই হোটেলের খাবার অনেক স্বাদ। খেলে মনে হয় যে বাড়ির খাবার খাচ্ছি। যে একবার খাবে, আবার খেতে আসবে। এখানে খাবার রান্না হয় মাটির চুলায় ও লাকড়ি দিয়ে। মশলাগুলো শীল পাটায় বাটা হয়। এমন হোটেল আর একটা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।’