শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

শরীয়তপুরে গণহত্যা : মাতৃস্তন মুখে মায়ের লাশের পাশে মৃত শিশু

একাত্তরের ২২ মে পাকবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে শরীয়তপুরের ৩৭০ জন নীরিহ শিশু ও নর-নারীকে। সেদিন সবার চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটলেও নিরূপায় বাঙালির কিছুই করার ছিল না। দেশব্যাপী চলে পাকিস্তানিদের সেই গণহত্যা। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই ঝরে গেছে অনেক প্রাণ।

পাকিস্তানিদের সেই গণহত্যার দৃশ্য আজও ভাসছে তাদের চোখে। যারা একাত্তরে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন শরীয়তপুরের মুক্তিযোদ্ধা মো: আ: আজিজ শিকদার, আবদুস সামাদ তালুকদার,জলিলুর রহমান।

’৭১’র গণহত্যা বিষয়ে তার ভাষ্য, ১৯৭১ মে মাসের ২২ তারিখ ৫০ পাকিস্তানি সেনা মাদারীপুর ক্যাম্প থেকে লঞ্চযোগে শরীয়তপুরের নড়িয়া থানায় আসে।

প্রথমে তারা ঘড়িসার বাজার, ঝেলেপাড়া ও ঘোষপাড়া হিন্দুপ্রধান গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় ঘোষপাড়ার নালিত ঘোষকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেই সঙ্গে পূর্ব নড়িয়া গ্রামে ঢুকে নাসিমা বেগম, কানাই ছৈয়ালকে বর্বর সেনারা গুলি করে হত্যা করে। লোনসিং গ্রামে ঢোকে মুক্তিযোদ্ধা মনে করে চারজন পুরুষ ও তিনজন নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা।

মাদারীপুরে ফিরে যাওয়ার পথে বিকেল ৪টায় পাকিস্তানি সেনারা পালং থানার আংগারিয়া বন্দরে নামে। সেখানে রাজাকার সোলায়মান মৌলভী ও আজিজ মোল্লা তাদের সহযোগীসহ পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে আংগারিয়া বন্দরের ওপর দিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত মনোহর বাজার ও রুদ্রকর এলাকায় ঢোকে। তাদের দেখে মজিবর তালুকদারের রুটির দোকানের কর্মচারী কমরেড নুরুল ইসলাম (বর্তমানে আংগারিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের দফতরি) তার কোমরে লাল গামছা উড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, ‘মিলিটারি আইতে আছে, যে যেখানে আছো পালাও, পালাও, জীবন বাঁচাও।’

এভাবে তিনি রুদ্রকর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ান, এলাকার মানুষের কাছে খবর পৌঁছান এবং অনেককে নিরাপদে আশ্রয় নিতে সাহায্য করেন।

পাকিস্তানি বাহিনী আংগারিয়া বাজার অতিক্রম করে কাশাভোগ তালুকদার বাড়ি ব্রিজ পর্যন্ত যখন পৌঁছে। তখন কৃষক সামাদ শিকদার গরু নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন।

তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর দল দেখে দৌড় দিলে গুলি করে পাকিস্তানিরা। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন সামাদ শিকদার। পরে সম্ভু কর্মকার (কামার) লোহা দিয়ে দা-কাঁচি বানাচ্ছিল। তাকেও সেই অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরে নাগ বাড়িতে ঢুকে ৮৫ বছরের বৃদ্ধ উপেন্দ্রনাথ নাগকে গুলি করে হত্যা করে। গুলির শব্দ শুনে স্ত্রী তাবিনী বালা নাগ (৭৫) চিৎকার করে উঠলে তাকেও ফায়ার করে হত্যা করা হয়। পাশের বাড়িতে পালিয়ে থাকা একই পরিবারের শিবু সাহা ও তার ভাই গৌরাঙ্গ সাহা এবং শিবু সাহার তিন ছেলেসহ আরও একজন মহিলাকে গুলি করে ও পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

বিষেশ করে রাজাকারদের নেতৃত্বে এসব হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে কাশাভোগ গ্রামে। এ সময় ৮ মাসের শিশু পুত্র কৃষ্ণকে নিয়ে একটি মাটির গর্তের ভেতর পালিয়ে ছিল রাধা রানী। রাধা রানকেও ওরা গুলি করে মেরে ফেলে।

পরের দিন সকালে দেখা যায় রাধা রানীর ৮ মাসের শিশু পুত্রটি মাতৃস্তন মুখে মায়ের লাশের পাশে মৃত পড়ে আছে। পরে রাধা রানীর স্বামী হরি সাহা (৫০) ও তার মা চিরবালাকেও (৮০) হত্যা করা হয়।

পাক সেনাদের একটি দল সাথী বিড়ি ফ্যাক্টারির মালিক ভজনিতাই সাহার বাড়িতে ঢুকে রমনী সাহা ও মেয়ে শোভা রানী তার শ্বশুর বাড়ি থেকে আশ্রয় নিতে আসা ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

ঘাতকদের একটি দল দাস পাড়ায় ঢুকে মন্টু দাসের বোন সখী বালা দাসকে ধরতে যায়। সখী বালা তার দাদা, বৌদি ও তাদের ৬ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘাতকরা তখন জানালা দিয়ে গুলি করলে সখী বালার বুকে গুলি বিদ্ধ হয়। দাদা, বৌদি ও শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য সখী বালা গুলি খেয়েও চিৎকার করেনি। মন্টু দাস তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে পেছনের বেড়া ভেঙে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ওই সময় রাজাকাররা ঘরটিতে আগুন দিলে সখী বালাসহ ঘরটি পুড়ে যায়। এই দৃশ্য দেখে পাকিস্তানিরা বিকৃত উল্লাস আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

নির্যাতিতা নারী যুগল বালা পোদ্দারের ছেলে রতন পোদ্দার বলেন, আমার বাবা স্বামী গৌরাঙ্গ চন্দ্র পোদ্দার, কাকা নিপিন্দ্র নাথ পোদ্দার, শিক্ষক সুখদেব সাহা, জয়দেব সাহা, মনিকৃষ্ণ সাহা ও লক্ষ্মী চন্দ্র সাহাকে পাকিবাহিনী বেঁধে নিয়ে যায়। আমার মাকেসহ ১০-১২ জন যুবতী মেয়েকে একই বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নিকাড়ী বাড়ির কাছে নির্যাতন করে পাক হানাদাররা।

মুক্তিযোদ্ধা মো: আ: আজিজ শিকদার বলেন,, পাকসেনারা মধ্যপাড়ার কয়েকজন পুরুষকে ধরে এনে কলেমা পড়ানোর নাম করে রাস্তায় শুইয়ে রাইফেল দিয়ে পেটাতে থাকে। পরে মতিলাল সাহা, চন্দ্রাই ঠাকুর, ব্রাহ্মণ শ্রী চন্দ্র মোহন চক্রবতীকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে।

থেকে জানা যায়, একদিকে পাকবাহিনীর হত্যা ধর্ষণ অন্যদিকে রাজাকাররা কাশিপুর, দাদপুর ও চরচটাং থেকে দলে দলে এসে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে।

বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান খাঁন (দুলু) বলেন, যুদ্ধের ৯ মাসে সেখানে অনেক প্রাণ ঝরে যায়। অসংখ্য মরদেহ পড়েছিল। ২২ মের পরও পাকিস্তানি সেনারা আরও কয়েক দফায় এই এলাকার হানা দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হয়। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় এক নতুন রাষ্ট্র। বাঙালি অর্জন করে তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

৩৮ বছর পর ২০০৯ সালের ২২ মে মনোহর বাজার সংলগ্ন মধ্যপাড়া কালী মন্দিরের সামনে শরীয়তপুর পৌরসভার অর্থায়নে একটি স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়।