শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

সরকারি চাকরিতে থাকলে ধর্ষণের অভিযোগ কেন ‘হালকা’ হয়ে যায়

ধর্ষণের অভিযোগে রেলকর্মীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিং শুরুর ঘোষণা এসেছে। গত ১৮ জানুয়ারি রেলওয়ে বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ) তাসরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমের কাছে এ তথ্য নিশ্চিতও করেছেন। এর আগে অবশ্য লালমনিরহাট রেলওয়ে (জিআরপি) থানায় ধর্ষণ মামলা করা হয়। বাদী ছিলেন রেলওয়ে থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রুহুল আমীন। (সূত্র: আজকের পত্রিকা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪)

আগের ঘটনা

১৬ জানুয়ারি ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনে স্কুলছাত্রীকে (১৩) ধর্ষণের সময় হাতেনাতে আটক হন আক্কাছ গাজী (৩২)। তিনি বরিশাল সদরের পাতাং এলাকার বাসিন্দা। লালমনিরহাট রেলওয়ের সেলুন বেয়ারা ভারপ্রাপ্ত অ্যাটেনডেন্ট ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন ডিপোতে কাজ করতেন তিনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আক্কাছ গাজী ঘটনার দায় স্বীকার করেন।

ভুক্তভোগী ওই শিশুর বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে। মা-বাবার সঙ্গে সে গাজীপুরের জয়দেবপুরে থাকত। সেদিন তাঁর জয়দেবপুর রেলস্টেশন থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ছিল। ভুলবশত সে লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে পড়ে। এরপর সে ধর্ষণের শিকার হয়। ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে লালমনিরহাটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রেল কর্তৃপক্ষ আদালতের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের কাছে তাকে ফিরিয়ে দেয়।

প্রত্রিকার প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাবা মেয়েকে নিয়ে এখন আর গ্রামের বাড়িতে যাবেন না। শারীরিক ধকলের পর অবুঝ মেয়েটি কারও কটু কথা সহ্য করতে পারবে না। তার চেয়ে গাজীপুরে যেখানে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন, সেখানে চলে যাবেন। এখানে তাঁদের তেমন করে কেউ চেনে না। এ বিষয়ে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না।

মেয়েটির বাবা গাজীপুরে শ্রমিকের কাজ করেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুরে বসবাস করেন। ভুক্তভোগী মেয়েটির মা বিভিন্ন মেসে রান্নার কাজ করেন। বড় বোন একটি কারখানায় চাকরি করেন। নির্যাতনে শিকার মেয়েটি ঈশ্বরগঞ্জে গ্রামে থাকা তার ভাইদের (একজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী আরেকজন বাক্‌প্রতিবন্ধী) কাছে ফিরতে চেয়েছিল।

ধর্ষণের বিচার অগ্রাধিকারযোগ্য

ফৌজদারি অপরাধে অপরাধীর বিচার, বিশেষ করে ধর্ষণ মামলায় জামিন না দিয়ে নির্দিষ্ট বিচারিক আদালতে দ্রুত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীরা কোন বিশেষ ছাড় পেতে পারেন না।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত এক সরকারি কর্মকর্তার জামিনের ঘটনা অনেককে বিস্মিত করেছিল। তবে এটা নতুন কিছু নয়। এ ঘটনায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগের মামলায় সাময়িক বরখাস্ত জনৈক সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন ঢাকার একটি আদালত। (সূত্র: ডেইলি স্টার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩)

পুলিশের তদন্তেও এ ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপরও জামিনে বের হয়ে তিনি নিজ পদে বহাল থেকে নিয়মিত চাকরি করছেন। এমন ঘটনা নিয়মিত না হলেও মাঝেমধ্যেই ঘটছে। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাস করেন। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তো দূরের কথা, তিনি দিব্যি চাকরি করেছেন প্রতাপের সঙ্গে। অথচ ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাময়িক বরখাস্ত থাকার কথা ছিল। (সূত্র: আজকের পত্রিকা, ৫ এপ্রিল ২০২৩)

বিভাগীয় মামলা বা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিং কী

নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের জন্য বিভিন্ন সময়ে শৃঙ্খলা ও আচরণ-সম্পর্কিত বিধিবিধান প্রনয়ণ করে থাকে। কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এগুলোর পরিপন্থী কোনো কাজ করলে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত পদক্ষেপ বা কার্যক্রমকেই বিভাগীয় মামলা বা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিং বলে।

বিভাগীয় মামলায় কী শাস্তি হতে পারে

সরকারি চাকরি আইন (সার্ভিস রুল) ২০১৮-এর দশম অধ্যায়ে সরকারি কর্মচারীর অনুসরণীয় নীতি, আচরণ, শৃঙ্খলা ইত্যাদির বিশদ ব্যাখ্যা আছে। সরকারি চাকরির আইন অনুযায়ী, বিভাগীয় মামলায় লঘু অথবা গুরুদণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দণ্ডিত করতে পারবেন। আইনের ৩২ নম্বর ধারায় এ ব্যাপারে স্পষ্ট বর্ণনা আছে।

বলা হয়েছে, ‘নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, বিভাগীয় কার্যধারায় দোষী সাব্যস্ত কোনো কর্মচারীকে এতৎসংক্রান্ত বিধির বিধান সাপেক্ষে নিম্নবর্ণিত এক বা একাধিক লঘু বা গুরুদণ্ড আরোপ করিতে পারিবে, যথা:-

(ক) লঘুদণ্ডসমূহ-, (খ) গুরুদণ্ডসমূহ-

(ক) লঘুদণ্ডসমূহ-

(অ)  তিরস্কার;

(আ) নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ;

(ই)  বেতন স্কেলের নিম্ন ধাপে অবনমিতকরণ;

(ঈ) কোনো আইন বা সরকারি আদেশ অমান্যকরণ অথবা কর্তব্যে ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণে সরকারি অর্থ বা সম্পত্তির ক্ষতি সংঘটিত হইলে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়।

(খ) গুরুদণ্ডসমূহ-

(অ) নিম্ন পদ বা নিম্নতর বেতন স্কেলে অবনমিতকরণ;

(আ) বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান;

(ই) চাকরি হইতে অপসারণ;

(ঈ) চাকরি হইতে বরখাস্ত।

রেল কর্তৃপক্ষ যদি কঠোরতম গুরুদণ্ড দিতেও মনস্থির করে, তাহলেও ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা ওই ব্যক্তিকে বড়জোর চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারবে। অপরাধী হয়তো আরেকটা চাকরি নিয়ে আবার শিশুদের নির্যাতন, ধর্ষণে মেতে উঠবে। অপসারণ করতেও অনেক দিন লেগে যাবে। তত দিন অপরাধী আইন অনুযায়ী সরকারি কোষাগার থেকে খোরপোষ ভাতা পাবে।

কত দিন লাগতে পারে

এ বিষয়ে কোনো সময়সীমা স্পষ্ট করে বলা যাবে না। নিকট অতীতে ধর্ষণে অভিযুক্ত এক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি হতে সময় লেগে যায় প্রায় চার বছর। এটাই স্মরণকালের দ্রুততম নিষ্পত্তি বলে থাকেন অনেকে।

সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত অবস্থায় মেহেদি হাসান (উপসচিব)  দূতাবাসের সেফ হোমে আশ্রয় নেওয়া নারী শ্রমিকদের নিয়মিত হেনস্তা ও ধর্ষণও করতেন। ভয়ে, লজ্জায় ও আশ্রয় হারানোর আশঙ্কায় নির্যাতনের শিকার নারীরা অভিযোগ করতেও ভয় পেতেন।

রক্ষক যখন ভক্ষক, তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে কান্নাকাটি করা ছাড়া তাঁদের কোনো পথ থাকে না। তারপরও ভুক্তভোগীদের করা শারীরিক হেনস্তা ও ধর্ষণের অভিযোগ আমলে নেয় দূতাবাস ২০২০ সালে।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ধর্ষককে ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি রিয়াদ থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সৌদি আরবের মাটিতে ধর্ষণ করলে তারা সাধারণত বিদেশি কাউকে ছাড় দেয় না। স্পষ্টতই তাঁকে সেখানকার বিচারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়।

ঢাকায় আসার পর ধর্ষক আমলাকে করা হয় বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)। যুক্ত করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। এরপর নিয়ম রক্ষার বিভাগীয় মামলা শুরু হলে ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

তদন্তের নানা অলিগলি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত হলে ২০২৩ সালের ৬ জুলাই এই আমলাকে চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। সেই সময় দেওয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘তদন্তে মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে সেইফহোমে আশ্রিত কতিপয় গৃহকর্মীকে অপ্রয়োজনীয় একান্ত সাক্ষাৎকারের নামে অশ্লীল প্রশ্ন ও আচরণসহ বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা এবং যৌন নির্যাতন (ধর্ষণ) করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।’

এই চাকরিচ্যুতিই তাঁর একমাত্র শাস্তি হতে পারে না। যে অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড সেই অপরাধের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত হয়নি। আমলার লালসার শিকার নারীরাও কোনো বিচার পাননি। রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ছাড়া এই ভুক্তভোগীদের পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া কি সম্ভব?

ধর্ষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিচার না করায় সাধারণ পাঠকেরা সংবাদপত্রে বিভিন্ন মতামত জানান। এর মধ্যে কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো।

ক) ‘ফৌজদারি পেনাল কোড অনুযায়ী, জেল, জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ কোথায়? লম্পটদের এভাবে ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতের জন্য কী দৃষ্টান্ত থাকল? তাকে কমপক্ষে ধর্ষণের সর্বনিম্ন শাস্তি জেল (কত বছর জানা নেই) ও জরিমানা করা জরুরি আবশ্যক। নয়তো বিচারের বাণী নিভৃতেই কাঁদতে থাকবে।’

খ) ‘ধর্ষণের শিকার নারী একজন রেমিট্যান্স-যোদ্ধা। তাঁর প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের এমনিতেই সম্মান থাকা উচিত, বোঝা উচিত তাঁদের কষ্টের আয়করের টাকায় তাঁদের বেতন হয়, বোনাস হয়, দেশের মেগা প্রজেক্ট হয়। ধর্ষণ করে ওই কর্মকর্তা পার পেয়ে গেলে একটা অন্যায় উদাহরণ সৃষ্টি হবে।’

গ) ‘দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য যাঁরা অমানবিক পরিশ্রম করেন, তাঁদের সঙ্গে এমন ঘৃণ্য অপরাধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। ওই অমানুষকে শুধু চাকরিচ্যুত করলে হবে না। তার সম্পদ ক্রোক করে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হোক এবং অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।’

পাঠকদের প্রতিক্রিয়া আরও আছে; সেসবের মধ্যে বেগ-আবেগ দুটিই আছে। যুক্তি, আইন, ন্যায়-নীতি, সবকিছু ছাপিয়ে সবারই একই কথা, ন্যায্য বিচার হয়নি। আমরা প্রায়ই শুনি, ‘অপরাধীদের কোনো ছাড় নেই।’ তাহলে যে ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সেই অপরাধের শাস্তি কীভাবে চাকরি থেকে অপসারণে চুকে যাবে?

সরকারি চাকরিতে থাকলে যেকোনো ফৌজদারি অপরাধ করে পার পাওয়া যায়—এমন একটা বিশ্বাস মানুষের মনের মধ্যে ক্রমেই ‘বিকশিত’ হচ্ছে। অপরাধীরা দিনের পর দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

শিশু গৃহকর্মীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার গুরুতর অভিযোগের পর ১৯ বছর ধরে বিচার এড়িয়ে দিব্যি চাকরি করে অবসরে যাওয়ার ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। অপরাধের পর অভিযুক্ত চিকিৎসক দম্পতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার এবং হাজতবাসের সময়কে ব্যক্তিগত কারণে অনুপস্থিতি দেখিয়ে অর্জিত ছুটিতে রূপান্তরিত করা হয়।

আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি ফৌজদারি আইনের আওতায় যথাযথ আদালতেই হওয়া উচিত। আমরা ভালো করেই জানি, ফৌজদারি মামলা হলেও অনেক ভুক্তভোগীর পক্ষে মামলা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। মামলা চালানো তাঁদের কাছে হাতি পোষার শামিল।

কোন না কোনভাবে আদালত পর্যন্ত পৌঁছালেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কারণে নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক মানুষের পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।

দেশে বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত সহায়তার ব্যাপ্তি ও মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। দেশের মানবাধিকার, নারী অধিকার, শিশু অধিকার সংগঠনগুলো কি বিষয়টি একটু আমলে নেবে? একবার তাঁরা কি কোমর বেঁধে দাঁড়াবেন?