শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

‘ভাষা আন্দোলনের গতি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ শিক্ষার্থীদের আদর্শ’

লাল হয়েছে পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার ডাল। এ যেন রফিক, শফিক, জব্বার ও শফিউলদের তাজা রক্তের প্রতিচ্ছবি। আর এই প্রতিচ্ছবি থাকবে চিরকাল। মায়ের ভাষার জন্য গৌরবের এমন আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালি জাতির। গৌরবের এমন ইতিহাস গড়তে কারফিউ ভেঙে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানের মিছিল। শহরে কারফিউ ভেঙে ভাষা আন্দোলনের আগুন গ্রামে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ভাষাসৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী।

সম্প্রতি ভাষা আন্দোলন নিয়ে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা হয়েছে ভাষাসৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরীর। শরীয়তপুরের যারা ভাষাসৈনিক, তাদের মধ্যে বেঁচে আছেন মাত্র আটজন। এদের মধ্যে ভাষাসৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী স্বদেশী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।

ভাষাসৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী বলেন, ভাষা আন্দোলনের সময় ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল ছিল শরীয়তপুর। রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন ছিল না গ্রামে। যোগাযোগের মাধ্যম ছিল চিঠি ও নৌপথ। ফলে দূরের কোনো খবর শরীয়তপুরে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগত। তবে দেশে যে কিছু একটা গণ্ডগোল হতে যাচ্ছে, তা গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষও অনুভব করত। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে যখন ছাত্রদের মিছিলে গুলি করা হয়, তখন সাথে সাথেই সেই খবর শরীয়তপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জানত না। হঠাৎ কেউ একজন মাদারীপুর থেকে এসে খবর দিল ঢাকায় রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রদের মিছিলে গুলি করা হয়েছে। কয়েকজন ছাত্র মারা গেছেন। ছাত্ররা এই খবর প্রচার করলে শরীয়তপুরে এক প্রকার অঘোষিত হরতাল হয়ে যায়। বাজার-ঘাট বন্ধ হয়ে চারপাশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে থাকে।

তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের সময় আমি পালংয়ের তুলাসার গুরুদাস উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলাম। অনান্য সময় ঢাকায় থাকলেও তখন বাড়িতেই ছিলাম। স্কুলে একদিন হঠাৎ ছাত্ররা একত্রিত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে শুরু করল। আমিও সবার সঙ্গে গিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করলাম। মিছিল স্কুল থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় আসলে খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ যোগ দিয়েছিল। মিছিলে একটাই স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এর মধ্যে পুলিশ এসে মিছিলে বাধা সৃষ্টি করে। ছাত্ররা পুলিশের বাধা না মানলে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও মিছিলে গুলি করেনি পুলিশ। ভাষা আন্দোলনের মিছিল করতে গিয়ে ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা, আব্দুল মান্নানসহ অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মূলত যারা ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদেরকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হওয়া গোলাম মাওলাই মূলত শরীয়তপুর-মাদারীপুর অঞ্চলের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী বলেন, গ্রামের ধনাট্য কৃষক পরিবারের সন্তানেরা তখন ঢাকায় পড়াশোনা করত। গ্রামে থাকা মা-বাবা তখন জানতে পারতেন না যে, তাদের প্রিয় সন্তান বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। সবাই তখন উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতেন। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন। ধনীর ছেলেরা তখন মিছিলে যেত, পিছিয়ে পড়া দরিদ্র মানুষ, অশিক্ষিত মানুষ যাদেরকে এক শ্রেণির লোকে মূর্খ বলে তাদের ছেলেরাও মিছিলে যেত। ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য আন্দোলনের মিছিল সংগ্রাম শেষে যখন এসব ছেলেরা গ্রামে ফিরত, তখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই তাদেরকে সম্মান করত, তাদের নিয়ে গর্ববোধ করতো। এসব কারণেই ভাষা আন্দোলনসহ পরবর্তী সময়ে অন্যান্য আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের গতি এতটা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ ছিল শিক্ষার্থীদের আদর্শ। এখন অনেক ছাত্র লেজুড়বৃত্তি করে কিন্তু তখনকার ছাত্রদের নির্দিষ্ট আদর্শ ছিল।

তিনি আরও বলেন, ভাষা না থাকলে মানুষ বোবা হয়ে থাকে। মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করতে হলে ভাষা দরকার এবং সেই ভাষা হতে হবে মাতৃভাষা। নিজেকে তৈরি করা, সুশিক্ষত করা সবই মানুষ ভাষার মাধ্যমে করে থাকে। মাতৃভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র হওয়ার পরেই মূলত ছাত্ররা জেগে উঠল। ছাত্রদের আন্দোলনে দেশের মানুষ যোগ দিয়ে সাড়া তৈরি করল।

ভাষাসৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী বলেন, আমার মুখের ভাষা বাংলা বলে আমি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা মানতে পারিনি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা চেয়েছি। বাংলা এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল, যার যার মায়ের ভাষায় সে সে কথা বলবে, পড়বে, লিখবে। কিন্তু বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে যারা বাংলা ভাষাভাষী নয়, তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতি এখনো বাংলাদেশ দেয়নি। এটা তো ঠিক নয়।

শরীয়তপুরের ভাষা সৈনিকদের ‘৫২’র ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী আমরা পালংয়ের কজন’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। ওই সংগঠনের সভাপতি ভাষাসৈনিক জালাল আহমেদ।

তিনি বলেন, ঢাকাতে যখন ভাষা আন্দোলন শুরু হয়, তখন আমরা তুলাসার স্কুলে পড়াশোনা করতাম। বড় ভাইদের নেতৃত্বে আমরা ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে পোস্টারিং করেছি। পালং বাজারসহ বিভিন্ন সড়কে মিছিল করেছি। রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী ছিল ওই বড় ভাইদের একজন। উনি মিছিলের সামনের দিকে থাকতেন। শরীয়তপুরে ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে উনার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে যখন শরীয়তপুরে শহীদ মিনার ছিল না। তখন আমরা কলা গাছ দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করে প্রভাত ফেরীর মিছিল করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতাম। শরীয়তপুরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেও রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। আমরা যারা ভাষা আন্দোলন করেছি, তাদের অনেকেই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন। এখন আমরা মাত্র আটজন বেঁচে আছি।

শরীয়তপুর জেলা পরিষদ থেকে গত বছর সম্মাননা পেয়েছেন ভাষা সৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছাবেদুর রহমান খোকা শিকদার বলেন, আমাদের মহান একুশ এদেশের ভাষাসৈনিকদের সৃষ্টি। বাঙালি জাতি ভাষার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে যেভাবে রক্ত দিয়ে নাম লিখিয়েছে, তার নজির তুলনাবিহীন। রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী শরীয়তপুরের ভাষা সৈনিক। তাকেসহ অন্যান্য ভাষা সৈনিকদের শ্রদ্ধা জানিয়ে জেলা পরিষদ থেকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আমৃত্যু। কেননা, তারা না হলে আমি মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারতাম না, স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতাম না। ভাষা সৈনিকসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই আমি। শরীয়তপুরে এখন মাত্র আটজন ভাষাসৈনিক বেঁচে আছেন, তাদের সুস্বাস্থ কামনা করছি।

ব্যক্তিজীবনে চিরকুমার ভাষাসৈনিক রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী শরীয়তপুরের বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবার ঘটক বাড়িতে ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সূর্যকান্ত ঘটক চৌধুরী স্বদেশী আন্দোলন ও ভাই রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনসহ অন্যান্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রমেন্দ্র ঘটক চৌধুরী নিজের বাড়িতে এসব আন্দোলনের বিভিন্ন মিটিং দেখে রাজনৈতিক পরিবেশেই বড় হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে বাবা সূর্যকান্ত ঘটক চৌধুরী ও বড় ভাই রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৫২ সালে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি ঘটক বাড়িতেই বসবাস করছেন।