শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

এবারও গ্রীষ্মে থাকছে লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা ডলার—দুটির সংকটেই ভুগছে বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে টাকার ঘাটতি মেটাতে যাচ্ছে সরকার। এতে দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে ভারতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ও জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের জোগানের অনিশ্চয়তা কাটেনি। এতে গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে উৎপাদন সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। তবে ঘাটতি আছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেলের (ডিজেল, ফার্নেস) সরবরাহে। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় গত দুই বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে ব্যাপক লোডশেডিংয়ে ভুগতে হয়েছে ভোক্তাদের। এর মধ্যে গত বছর গ্রীষ্মের আগে টানা তিন দফা দাম বাড়িয়েও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।

এবার গ্রীষ্ম মৌসুমে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। গত বছরের চেয়ে চাহিদা বেড়েছে ১১ শতাংশের মতো। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও বেড়েছে একই হারে। তবে গত বছরের মতোই সক্ষমতার বড় একটি অংশ বসিয়ে রাখতে হতে পারে জ্বালানির অভাবে। গড়ে ২৫ শতাংশ সক্ষমতা বসে ছিল সর্বোচ্চ চাহিদার সময়েও। এর বাইরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত বন্ধ থাকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সক্ষমতা। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকুক বা বন্ধ থাকুক, চুক্তি অনুসারে সব কেন্দ্রকে ভাড়া পরিশোধ করতে হয়; যা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত। গত অর্থবছরে পিডিবি ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া পরিশোধে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, গত বছর ৪১ শতাংশ সক্ষমতা অলস বসে ছিল।

চুক্তি অনুসারে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তা পাইকারি দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে, যারা খুচরা দামে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়। গত দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১১ বার ও ভোক্তা পর্যায়ে ১৩ বার বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এখন গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খুচরা দাম ৮ টাকা ২৫ পয়সা। আর পাইকারি দাম ৬ টাকা ৭০ পয়সা। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাত থেকে ভর্তুকি তুলে দিতে হলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১২ টাকা ১১ পয়সা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ে গড়ে বিদ্যুতের দাম হবে প্রায় ১৫ টাকা। একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে দাম বাড়াতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। মার্চ থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে এক দফা দাম বাড়াতে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি-গবেষণা সংস্থা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সর্বোচ্চ চাহিদা মাথায় রেখেই উৎপাদন পরিকল্পনা করা হয়েছে। জ্বালানির কারণে পরিকল্পনামতো উৎপাদন করা না গেলে লোডশেডিং হতে পারে। ৫০০ থেকে ১০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং ভোক্তা মেনে নেয়। তবে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাটা পিডিবির জন্য কিছুটা স্বস্তির হবে।

এবার গ্রীষ্মের আগেই ঢাকার বাইরে কিছুটা লোডশেডিং শুরু হয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারিও দিনে সর্বোচ্চ ৩৮৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। তবে এটা মূলত দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিভিন্ন এলাকায়। দেশের অধিকাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে তারা। আরইবি বলছে, চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ময়মনসিংহ এলাকায় বেশি এটি। এতে আগামী গ্রীষ্ম নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে আরইবি ও বাকি পাঁচ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, গত বছর কোনো কোনো দিনে সর্বোচ্চ তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। এতে ঢাকায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা এবং কোনো কোনো গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায়নি মানুষ।

সাধারণত মার্চ থেকে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়তে থাকে। এটি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। মাঝে বর্ষার কারণে জুন-জুলাইয়ে চাহিদা একটু কমে যায়। আর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা হয় এপ্রিলে। দেশে এখন পর্যন্ত দিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে গত বছরের ১৯ এপ্রিল।

ওই দিন রাত নয়টায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট। তাতেও চাহিদা পূরণ করতে না পারায় ৪২৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময় গ্যাস থেকে আসে ৬ হাজার ২৫২, জ্বালানি তেল থেকে ৫ হাজার ৫৯৩, কয়লা থেকে ২ হাজার ৬৬৮, জলবিদ্যুৎ থেকে ৭০ ও আমদানি থেকে এসেছে ১ হাজার ৮৫ মেগাওয়াট।

গত বছর বিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল ২২ হাজার ৫৬৬ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদন করা হচ্ছে দিনে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট।

গত বছরের মতো এবারও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভরসার জায়গা গ্যাস। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা দিনে প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। গত বছর সর্বোচ্চ ১৩০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ কোটি ঘনফুট। এবার গ্রীষ্মে দিনে অন্তত ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চেয়েছে পিডিবি। যদিও গ্যাস সরবরাহ গত বছরের চেয়ে বাড়ানোর তেমন সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা সূত্র। তার মানে গ্যাস থেকে এবারও সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট পাওয়া যেতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতা আছে প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট। এর বাইরে আরও দুটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ দুটির সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

গত বছর সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে জ্বালানি তেল থেকে। এবার সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করতে চায় পিডিবি। জ্বালানি তেলে ৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা আছে। এর জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া শোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে। বকেয়ার চাপ ও ডলারের জোগান নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হতে পারে।

তবে এবার সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করেছে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র। গত বছর কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট। তবে ডলার–সংকটে কয়লা আমদানি করা যায়নি। দুই দফায় বন্ধ রাখতে হয়েছে দেশের দুই বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র—পায়রা ও রামপাল। এবার আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়লায় সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট হয়েছে। বিশ্ববাজারে কয়লার দাম কম। কিন্তু কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। দেশের প্রায় সব কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রেরই বিল বকেয়া।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, পটুয়াখালীর পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিল বকেয়া প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এ কারণে ছয় মাস বিলম্বে কয়লার বিল দেওয়ার সুযোগ থাকার পরও নিয়মিত বিল দিতে পারছে না তারা। কয়লা সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানি সুদসহ বিল পরিশোধের তাগাদা দিয়ে চিঠি দিচ্ছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পর্যন্ত কোনো বিল পায়নি।

ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের গোড্ডা এলাকায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিয়মিত সরবরাহ করছে। তবে সবচেয়ে বড় এ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের মাসে বিল গড়ে ৮ থেকে ৯ কোটি ডলার। তারা মাঝেমধ্যে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ ডলার করে বিল পাচ্ছে। এতে বিল বকেয়া হয়েছে ৫০ কোটি ডলারের বেশি। এভাবে বকেয়া বাড়তে থাকলে উৎপাদন ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বন্ড ইস্যুর পরও চার থেকে পাঁচ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। বকেয়া আর বাড়ানো যাবে না, প্রতি মাসে নিয়মিত বিল দিতে হবে। একই সঙ্গে ডলারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে খারাপ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তাদের মাসের বিল বাড়বে। একই সঙ্গে বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়তে পারে। এত চাপ ভোক্তার জন্য অসহনীয় হতে পারে। তাই দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে যেতে পারে পিডিবি। জ্বালানি তেল থেকে কমিয়ে গ্যাস ও কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলে খরচ কমার সুযোগ আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, গত বছরও গ্রীষ্ম মৌসুমের আগে বকেয়া শোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় সরকার। এরপরও বিল বকেয়া ছিল এখনকার মতো চার থেকে পাঁচ মাসের। এ ছাড়া গত বছর জ্বালানি আমদানির অন্তত ৫০ শতাংশ ডলার সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও লোডশেডিং করতে হয়েছে। আর এবার ডলার সরবরাহ পরিস্থিতি আরও নাজুক। তাই এবারের গ্রীষ্মেও লোডশেডিংয়ে ভুগতে হতে পারে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, খরচ না কমিয়ে বাড়তি উৎপাদন খরচের দায় ভোক্তার ওপর চাপানো হচ্ছে। এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সরকারের ভর্তুকি কমানো যাবে। তবে এতে ডলার–সংকট কাটবে না, জ্বালানি আমদানি সমস্যারও সমাধান হবে না। তাই দাম বাড়িয়ে লোডশেডিং ঠেকানো যাবে না।