সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪, ৩১ আষাঢ়, ১৪৩১, ৮ মহর্‌রম, ১৪৪৬

পুলিশের উপর হামলা করে মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনিয়ে নিলো যুবলীগ নেতা

গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করার পর স্থানীয় যুবলীগ নেতার হামলার শিকার হয়েছেন জাজিরা থানার চার পুলিশ সদস্য। বুধবার (২৮-ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড় গোপালপুর ইউনিয়নের সূর্যমণি বাজারে এ ঘটনাটি ঘটে। এসময় পুলিশের হাত থেকে ৫০০ গ্রাম গাঁজা সহ দুই মাদক কারবারিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় ওই যুবলীগ নেতা।

জাজিরা থানা পুলিশ এবং ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, জাজিরা থানার এএসআই বেলাল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার জাজিরা থানার পুলিশ কন্সটেবল জোহান, সবুজ ও ফারুককে সাথে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে সূর্যমণি বাজারের পাশের বালুর মাঠের পিছনে থাকা নদীর পাড় থেকে আনুমানিক ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী আরিফ(২৮) ও যুবলীগ নেতা সাগর মাদবরের বড় ভাই সবুজ মাদবর(৩২)-কে আটক করে।

খবর পেয়ে বড় গোপালপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি দাবী করা সাগর মাদবরসহ বেশ কয়েকজন স্থানীয় মাদক কারবারি ও জুয়াড়ি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ডাকাত ডাকাত বলে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ধরে মারধর করতে শুরু করে। এসময় এএসআই বেলাল সহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে গাঁজাসহ আটককৃ আরিফ ও সবুজ মাদবরকে ছিনিয়ে নেয় যুবলীগ নেতা সাগর মাদবর। পরে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের কিল-ঘুষি মারতে থাকে সবুজ সাগরসহ তাদের সঙ্গে থাকা অন্যান্যরা।

ঘটনার তীব্রতা বুঝতে পেরে আশেপাশে থাকা স্থানীয় লোকজনপুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়। বিষয়টি জানতে পেরে জাজিরা থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) মোঃ সুজন হকের নেতৃত্বে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালায়। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকেই আর আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে ১০-১৫ জন অজ্ঞাতনামা সহ সাগর মাদবর, সবুজ মাদবর এবং আসিফসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক জাজিরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন এএসআই বেলাল।

তবে যুবলীগ নেতা সাগর মাদবর তাৎক্ষণিক ফেসবুক লাইভে এসে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহন এবং স্থানীয়দের নানা হয়রানিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ তুলে পুলিশকে গালাগালি করেন। সাগর মাদবরের আইডি থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরা আরেকটি ভিডিওতে সাগর মাদবর, সবুজ মাদবর এবং আরিফ সহ বেশ কিছু লোকজন মিলে পুলিশ সদস্যদের মারধর ও গালাগালি করতে শোনা যায়। অবশ্য রাতেই ভিডিও গুলো সরিয়ে নেন ওই যুবলীগ নেতা।

ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট এএসআই বেলাল জানান, অত্র ইউনিয়নের মধ্যে ফোরকান মাদবর অন্যতম প্রভাবশালী লোক। সাগর ও সবুজ ফোরকান মাদবরের ছোটভাই কুদ্দুস মাদবরের ছেলে। ফোরকানের ভাতিজা হওয়ায় স্থানীয় কেউই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না। গত দু’দিন আগেও জাজিরা থানার এএসআই বেলাল গাঁজা আছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে সাগরের ভাই সবুজ মাদবরকে তাড়া করেন। এছাড়াও সবুজ মাদবরের বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা সহ বেশ কিছু মামলা রয়েছে বলে দাবি জাজিরা থানা পুলিশের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, সাগর মাদবর কিছু মানুষকে জিম্মি করে পুলিশের উপর হামলা করিয়েছেন। তার ভাই সবুজের নামে ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সে একজন মাদকাসক্ত হিসেবেই এলাকায় বেশ পরিচিত এবং ছয়মাস রিহ্যাবেও ছিলেন। রিহ্যাব থেকে ফিরে পুনরায় আবার মাদক সেবন ও মাদক ব্যাবসা শুরু করেন সবুজ মাদবর। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে পুলিশ সদস্য বেলাল তাকে ধরতে গেলে।

পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় জড়িত যুবলীগ নেতা সাগর মাদবরের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে ফোরকান মাদবরকে কল করলে তিনিও কল রিসিভ করেননি। এমনকি সরেজমিনে গিয়েও অভিযুক্ত কাউকেই তাদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তারা সবাই ঘরে তালা মেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে।

বড় গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান (লিটু সরদার) ঘটনাটিকে খুবই বিব্রতকর দাবী করে বলেন, যারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে তারা আসলেই মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের বহু অভিযোগ রয়েছে, তাই এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে তিনি তার সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করবেন বলেও জানান।

পুলিশের উপর হামলা করে মাদক কারবারি ছিনিয়ে নেয়ার বিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, ঘটনার সাথে-সাথেই ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। রাত থেকে এখনও পর্যন্ত অতিরিক্ত পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নড়িয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আহসান হাবিব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিক – নির্দেশনা প্রদান করেন। তবে এ বিষয়ে মিডিয়ায় আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য দিতে তিনি রাজি হননি।

উল্লেখ্য: জাজিরা থানার গত প্রায় ছয় মাসের মাদক বিরোধী অভিযান গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাজিরা থানায় কর্মরত এএসআই বেলাল প্রায় প্রত্যেকটি অভিযানেই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। মাদক নির্মূলে তার এই ভুমিকার জন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে সনদ প্রাপ্ত হয়েছেন। তাই ধারণা করা হচ্ছে অল্পদিনে মাদক কারবারিদের ব্যাপক চাপে ফেলায় মাদক স্থানীয় কারবারিদের রোষানলে পড়েছেন এএসআই বেলাল।