সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪, ৩১ আষাঢ়, ১৪৩১, ৮ মহর্‌রম, ১৪৪৬

বারবার ডাকলেও আসেননি চিকিৎসক, শরীয়তপুর হাসপাতালে শিশুর মৃত্যু

ঠান্ডা ও পেটে ব্যথা নিয়ে তিন মাস বয়সী মুসাফিরকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। তার শারীরিক পরিস্থিতি খারাপ হলে একাধিকবার চিকিৎসককে খবর দিলেও তিনি আসেননি। এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশুটি।

বুধবার রাত ৯টার দিকে হাসপাতালে মুসাফিরের মৃত্যুর পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শরীফ-উর রহমানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন শিশুটির স্বজন ও শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্স।

অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার শরীফ-উর রহমান নার্সকে পরামর্শ দিয়েছিলেন অক্সিজেন খুলে শিশুটিকে তার কাছে নিয়ে যেতে। তবে শিশুটির অবস্থা শোচনীয় হওয়ায় নার্স অক্সিজেন খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবুও রোগীর কাছে যাননি ওই চিকিৎসক।

মুসাফির শরীয়তপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চরপালং গ্রামের রাজিব শেখ ও রুবিনা বেগম দম্পতির ছেলে।

মুসাফিরের মা রুবিনা বেগম বলেন, “আমার মানিক যখন অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন আমি নিচে অনেকবার দৌড়ে ডাক্তারকে ডাকতে যাই। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে উপরে পাঠিয়ে দিয়ে বলেন- ‘আমি আসতেছি’। কিন্তু ডাক্তার আর আসেনি।

“আজ যদি আমার মানিককে চিকিৎসা দেওয়া হতো তাহলে ও বেঁচে থাকতো। আমি আমার মানিকরে ছাড়া কীভাবে থাকবো।”

স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দুই দিন ধরে পেটে গ্যাস ও ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছিল মুসাফির। বুধবার দুপুরে শিশুটিকে নিয়ে আড়াইশো শয্যা বিশিষ্ট শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে যান রুবিনা বেগম।

এ সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন শরীফ-উর রহমান। তাকে শিশুটির অসুস্থতার বিষয়টি জানানো হলে তরল জাতীয় একটি ওষুধ লিখে দেন তিনি।

কিন্তু ওষুধটি খাওয়ানোর পর আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি। এ সময় বেশ কয়েকবার বমিও করে সে। অবস্থা খারাপ দেখে মা রুবিনা বেগম ও স্বজনরা জরুরি বিভাগে বেশ কয়েকবার চিকিৎসককে ডেকে আনতে যান।

তবে চিকিৎসক শরীফ-উর রহমান বিষয়টি আমলে না নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে আসেননি।

শিশুটির বাবা রাজিব শেখ বলেন, “ডাক্তারের অবহেলায় আমার বাচ্চা মারা গেছে। তাকে অনেকবার অনুরোধ করেছি বাবুকে দেখে যেতে। উনি আসেননি। আজ আমি ডাক্তারের জন্য সন্তানহারা হয়ে গেলাম। আমার বাচ্চার মতো আর কারও বাচ্চা যেন এভাবে চিকিৎসকের অবহেলায় মারা না যায় এটাই আমার দাবি।”

হাসপাতালে কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স সীমা বৈদ্য বলেন, “বাচ্চাটিকে প্রথমে আমি অক্সিজেন লাগিয়ে দিই। এরপর আমাকে বেশ কয়েকবার রোগীর লোক ডাকলে আমি বাচ্চাটাকে দেখে আসি।

“কিছুক্ষণ পর বাচ্চাটার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে ডাক্তারকে ডাকতে আমার ওয়ার্ড বয়কে দুইবার নিচে পাঠিয়েছি, ডাক্তার বলে বাচ্চাটার অক্সিজেন মাস্ক খুলে নিচে নিয়ে যেতে।

“কিন্তু বাচ্চাটার অবস্থা খারাপ হওয়ায় আমি অক্সিজেন মাস্ক না খুলে আয়াকে দিয়ে পুনরায় ডাক্তারকে ডাকতে পাঠাই। কিন্তু তিনি শুধু একই কথা বলেন। এক পর্যায়ে বাচ্চাটা মারা গেলে আমি নিচে গিয়ে ডাক্তারকে আর পাইনি।”

সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, “যখন বাচ্চাটির খারাপ অবস্থা ছিল তখন ডাক্তার এলে হয়তো বাচ্চাটা বেঁচে থাকতো।”

এ বিষয়ে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার শরীফ-উর রহমানকে তার মোবাইল ফোনে কল দিলে ঘটনার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “এমন অভিযোগ সত্য নয়। কেউ আমাকে জরুরি বিভাগে ডাকতে আসেনি।”

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক হাবিবুর রহমান বলেন, “অভিযোগের তদন্তে গাইনী বিভাগের প্রধান হোসনে আরা রোজীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। “

এছাড়া মেডিকেল অফিসার শরীফ-উর রহমানকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।