শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে পদ্মার বালুমহাল ইজারাপ্রক্রিয়া বন্ধের দাবি

শরীয়তপুর জেলার মানচিত্র

 

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা ইউনিয়নের বাঘাইয়া মৌজা এলাকায় ১৫ দশমিক ৮৮ একর পদ্মা নদীর অংশে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে জেলা প্রশাসন। এখন চলছে দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া।

এদিকে বালুমহাল ইজারা দিলে নদীভাঙন ও নদীর তীররক্ষা বাঁধ হুমকিতে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে চারটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গত বুধবার চিঠি দিয়েছেন। তাঁরা অবিলম্বে দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার দাবি জানান।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, জাজিরা উপজেলার নাওডোবা থেকে ভেদরগঞ্জের চরসেনসাস পর্যন্ত পদ্মা নদী। নদীর দুই তীরে তিনটি উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে ওই সব ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে ভাঙন রোধে পাউবো ওই সব এলাকায় অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

২০২১ সালের জুন মাসে প্রথম ভেদরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদ্মা নদীর কাচিকাটা এলাকার বাঘাইয়া মৌজায় বালুমহাল ইজারা দিতে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব পাঠান। ওই সময় সেটা হয়নি। গত বছরের ১৬ নভেম্বর ইউএনও আবার বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব পাঠান। নানা প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ২৫ নভেম্বর বিভাগীয় কমিশনার পদ্মা নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার অনুমতি দেন। এরপর গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে বর্তমান জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মেদ দরপত্র আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৯২ নম্বর বাঘাইয়া মৌজার বালুমহাল। সেখানের ১৫ দশমিক ৮৮ একর জমি থেকে এক বছরে (আগামী বছর ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত) ২ কোটি ৫৮ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫৩ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা যাবে। প্রতি ঘনফুট বালুর দাম ৪৮ পয়সা হিসাবে ১ কোটি ২৪ লাখ ১২ হাজার ৭৭৭ টাকা সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার কথা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাতজন দরপত্রের ফরম সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে পাঁচজন তা জমা দেন। ১১ মার্চ দরপত্রগুলো উন্মুক্ত করা হয়। তাঁর মধ্যে মাহাবুব শেখ সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। মাহাবুব শেখ বালুমহাল ইজারা পেতে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। মাহাবুব শেখ নড়িয়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য। তিনি নড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বাদশা শেখের ছেলে।

বালুমহাল ইজারা দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, দরপত্র খোলার পর জানা গেছে, একজন ইজারা নেওয়ার জন্য ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। কাগজপত্র সঠিক থাকলে ওই ব্যক্তিকে ইজারা প্রদান করা হবে।

মাহাবুব শেখের ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তাঁর ভাই বালু ব্যবসায়ী ইউনুছ শেখ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের নামে দরপত্র জমা দিলেও আমিই ব্যবসাটি পরিচালনা করব। আমরা যাতে পেতে পারি, সে জন্য বেশি দাম বলা হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে বেশি দামে বালু কিনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করব।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, বাঘাইয়া মৌজার বালুমহালের জন্য সরকার দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে দাম নির্ধারণ করেছে প্রতি ঘনফুট ৪৮ পয়সা। সেখানে মাহাবুব শেখ ৪ টাকার বেশি দরে এ বালুমহাল ইজারা নিচ্ছেন। এ দাম দেখেই ধারণা করা যাচ্ছে, মাহাবুব শুধু বালুমহাল নয়, আশপাশের আরও স্থান থেকে বালু তুলে এ খরচ পোষাবেন।

একই আশঙ্কা করছেন উপজেলার চরভাগা, কাচিকাটা, উত্তর তারাবনিয়া ও দক্ষিণ তারাবনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা। জনপ্রতিনিধিরা জানান, ওই চারটি ইউনিয়নের ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার অংশে ভাঙন রোধের জন্য তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে পাউবো। বালুমহাল ইজারা দিলে বাঁধ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিলীন হতে পারে বাড়িঘর, আবাদি জমিসহ আরও স্থাপনা। ফলে চার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দিয়েছেন।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর মোল্যা বলেন, ‘আমাদের পাশের এলাকা চাঁদপুরে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এর প্রভাবে বিভিন্ন গ্রাম নদীতে বিলীন হয়েছে। উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে ওই বালুমহাল বন্ধ করা হয়েছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙন বেড়ে যাবে। তাই বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছি।’

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, ভেদরগঞ্জের পদ্মা নদীর দক্ষিণ তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ৫৯৪ কোটি টাকার বাঁধটি চরবাঘা ইউনিয়ন থেকে তারাবনিয়া পর্যন্ত ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার। আর বালুমহালের প্রস্তাবিত স্থান নদীর উত্তর প্রান্তে। এর ভাটি ও উজানে কিছু এলাকা নদীভাঙনপ্রবণ।

মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইলিশ মাছের নির্বিঘ্ন প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জন্য মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের ছয়টি স্থানকে ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করেছে। তার একটি পদ্মা নদীর ভেদরগঞ্জের ১৫ কিলোমিটার। যে স্থানে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইলিশের অভয়াশ্রমের মধ্যে পড়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল হক বলেন, ইলিশের বিচরণক্ষেত্রের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। সে স্থানে বালুমহাল থাকলে ইলিশের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হবে। তখন ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

বালুমহাল ইজারার বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য দুই দিন চেষ্টা করেও জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মেদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে কল করলেও তিনি তা ধরেননি। খুদে বার্তা দিলেও কোনো সাড়া দেননি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। তাঁরা বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা ডাকবেন। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সেই সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।