বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১, ২০ জিলকদ, ১৪৪৫

ঐতিহ্যবাহী ফোরকার পাড় পুকুরে মাছ ধরার উৎসবে মেতেছেন শতাধিক জেলে

 

একটি পুকুরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাছ ধরা উৎসব। ঐতিহ্যকে ধরে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও মাছ ধরার উৎসবে মেতেছেন শতাধিক জেলে। উৎসব করে মাছ ধরার এমন দৃশ্যের আনন্দ উপভোগ করতে পুকুরের চারপাশে ভিড় করেছেন হাজারো দর্শনার্থী ও ক্রেতা। প্রায় ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে শরীয়তপুরের ফোরকার পাড় নামক স্থানে এমন মাছ ধরার আয়োজন যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয় আমরা ‘মাছে ভাতে বাঙালি’।

শনিবার (২০ এপ্রিল) সকাল ৮টা থেকে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের শুতলকাঠি গ্রামের ফোরকার পাড়ের ঐতিহ্যবাহী পুকুরটিতে মাছ ধরা শুরু করেন জেলেরা। উৎসব করে মাছ ধরার এ আয়োজন চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ও মাছ ধরার আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, শুতলকাঠি গ্রামের ফোরকার পাড়ে ঐতিহ্যবাহী পুরোনো একটি বিশাল পুকুর (দিঘি) রয়েছে। শুরু থেকেই পুকুরটির মাছ ধরা উৎসবের আয়োজন করা হয়। কিন্তু কারা প্রথমে এমন আয়োজন করে মাছ ধরার শুরুটা করেছিলেন, তা কেউই সঠিক ভাবে বলতে না পারলেও স্থানীয় বয়োজেষ্ঠ্যদের ভাষ্যমতে কমপক্ষে ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে এভাবেই পুকুরটির মাছ ধরা হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও শনিবার দিনটিকে মাছ ধরার জন্য নির্ধারণ করে পুকুরের ৩২ জন মালিক ও মাছ ধরা আয়োজক কমিটি। মাছ ধরার সময় নির্ধারণ হওয়ার পরে গত কয়েকদিন ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১১১ জন জেলে আয়োজক কমিটির নিয়ম মেনে মাছ ধরার জন্য দুই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা মূল্যের টিকেট ক্রয় করেন। এরপর শনিবার সকাল থেকে একযোগে ঝাঁকি জালের মাধ্যমে মাছ ধরা শুরু করেন তারা। জেলেদের মাছ ধরা দেখতে পুকুরের চারপাশে ভিড় করেন বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৩ হাজার দর্শনার্থী ও ক্রেতা। জেলেদের জালে বড় কোনো মাছ ধরা পড়লেই পুকুরের চারপাশ থেকে এসব দর্শনার্থী ও ক্রেতারা জয়ধ্বনি করে আনন্দ প্রকাশ করেন। মাছ ধরে বিক্রির এমন উৎসবকে কেন্দ্র করে পুকুরের এক প্রান্তে বসেছে অস্থায়ী মেলা। প্রতি বছর দলবদ্ধ হয়ে মাছ শিকারের বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে পুকুর পাড়ে জড়ো হওয়ার পর একযোগে ছন্দের তালে তালে পানিতে নেমে মাছ ধরা যেন বাঙালির ঐতিহ্যের জয়গান।

আবদুর রহিম মিয়া, আতাউর রহমানসহ কয়েকজন শরীয়তপুর চোখকে বলেন, এই দিঘিটির বয়স প্রায় ২০০ বছরের অধিক। দিঘিটি থেকে আমার বাবা ও দাদাও উৎসব করে মাছ শিকার করেছেন। বয়সের কালে আমিও উৎসব করে মাছ শিকার করতাম। আজ আমার ছেলেরা মাছ শিকার করছে। আমি দর্শক হয়ে আনন্দ করে মাছ শিকার দেখছি।

নড়িয়া উপজেলার বালাখানা নামক স্থান থেকে মাছ শিকারের উৎসব দেখতে এসেছেন প্রীতম কুমার রায়। তিনি শরীয়তপুর চোখকে বলেন, আমি জানতে পেরেছি পুকুরটি ২০০ বছরের পুরোনো। ২০০ বছর ধরেই উৎসব করে মাছ শিকার করা হয় পুকুরটি থেকে। এসে দেখলাম শতাধিক জেলে কলা গাছের ভেলা ভাসিয়ে উৎসব করে মাছ শিকার করছেন। পুকুরের চারপাশে হাজারো দর্শক উৎসবের সঙ্গে মাছ শিকারের দৃশ্য দেখছেন। তাদের সঙ্গে আমিও মাছ শিকারের এমন দৃশ্য উপভোগ করেছি। যাওয়ার সময় আমার সাধ্যমতো মাছ আমি ক্রয় করব পরিবারের সদস্যদের জন্য।

সুকান্ত নামে আরও একজন বলেন, মাছে ভাতে বাঙালি কথাটা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে এখন। কিন্তু এই পুকুরটি থেকে ২০০ বছর ধরে উৎসব করে মাছ শিকার, পুকুর পাড়ে মাছ বিক্রি ও বাড়ির চারপাশে মাছ ভাজার ঘ্রাণে এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমি আমার বন্ধুর বাসায় পাঁচটি মাছ ভাজা খেয়েছি। এখন মনে হচ্ছে আমরা সত্যি সত্যি মাছে ভাতে বাঙালি।

মাছ ধরা আয়োজক কমিটির প্রধান বিল্লাল হোসেন শরীয়তপুর চোখকে বলেন, আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। ফোরকার পাড়ের এই পুকুরটি থেকে মাছ শিকারের বিষয়টি ২০০ বছরের ঐতিহ্য। আমরা প্রতি বছর একই দিনে, একই সময়ে মাছ ধরা এমন আয়োজন করে থাকি। অনেক দূর দূরান্ত থেকে জেলে ও দর্শনার্থী এখানে আসেন। বর্তমান প্রজন্ম হয়ত কিছুদিন পরে ভুলেই যাবে পুকুর থেকে মাছ ধরা যায়। এভাবে মাছ শিকারের বিষয়টি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বাঙালির ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে যাবে বলে আমি আশাবাদী। ২০০ বছরের ধারাবাহিকতা আমরা বজায় রেখেছি। জেলেরা উৎসব করে মাছ শিকার করছেন। অন্যদিকে উৎসবের সঙ্গে দর্শনার্থীরা দেখছেন, ক্রেতারা ক্রয় করছেন। আগামী বছর মাছ ধরার এই আয়োজনকে আরও সম্মৃদ্ধ করব ইনশাআল্লাহ।

কনেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান বাচ্চু শরীয়তপুর চোখকে বলেন, ফোরকার পাড়ের পুকুরটি ২০০ বছরের অধিক পুরোনো। জানতে পেরেছি ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে এভাবেই উৎসব করে মাছ ধরা হয় পুকুরটি থেকে। বাঙালির অবিচ্ছেদ্য বিষয় হলো মাছ। মাছ শিকারের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আয়োজক কমিটিকে আমি ধন্যবাদ জানাই।