বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩১, ১১ মহর্‌রম, ১৪৪৬

মোস্তাফিজ ও ফয়সালের খোঁজে গোয়েন্দারা স্বর্ণ ব্যবসার নামে সঞ্জীবায়

 

স্বর্ণ ব্যবসার বিষয়ে আলোচনার নাম করে এমপি মো. আনোয়ারুল আজিম আনারকে বন্ধু গোপালের বাসা থেকে ডেকে নেয় কিলাররা। ঘাতকরা তাকে রিসিভ করে নিয়ে যায় কলকাতা নিউ টাউন এলাকার সঞ্জীবা গার্ডেনের ডুপ্লেক্স বাসায়। সেখানেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এমপি আনারকে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ঘাতক সিয়াম নেপালে এবং মূল মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহীন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়েছে। তবে মোস্তাফিজুর রহমান ফকির এবং ফয়সাল আলী এখনো বাংলাদেশে আছে। এ দুজনের খোঁজে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। অভিযানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গ্রেফতার শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ এবং ভারতে গ্রেফতার জিহাদের দেওয়া তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারত থেকে ঢাকায় আসা তদন্ত দলের সদস্যরাও গ্রেফতারকৃতদের দ্বিতীয় দিনের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এতে প্রাপ্ত তথ্য তারা ভারতে পাঠাচ্ছেন। এর ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চলছে। তবে যেভাবে তার মরদেহ কেটে টুকরো করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এখন তা উদ্ধারের সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে হাড়গুলো পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। হত্যাকাণ্ড থেকে লাশ গুমের পুরো মিশনটি যেন কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য কাটআউট পদ্ধতি অবলম্বন করে খুনিরা। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে কাটআউট পদ্ধতি ভেদ করার চেষ্টা করছে পুলিশ। ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শাহীনকে আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাইতে পারে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে বলে জানা গেছে।
এদিকে এমপি আনার হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার তিনজনকে ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা হলেন তানভীর ভূঁইয়া, শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ ও সেলেস্তি রহমান। শুক্রবার আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে রিমান্ড আবেদনের শুনানির সময় আসামি সেলেস্তি রহমানকে আদালতের কাঠগড়ায় উঠানো হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কলকাতার দমদম বিমানবন্দর লাগোয়া নিউটাউনে খুন হন এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার। স্নায়ুরোগের চিকিৎসা নিতে তিনি ১২ মে দর্শনা-গেদে সীমান্ত দিয়ে কলকাতা যান। এর পরদিন থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। মূলত সেদিনই (১৩ মে) তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে ২২ মে। ওইদিনই রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন (২৪) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ডিবি সূত্র জানায়, রিমান্ড প্রাপ্ত তিন আসামির মধ্যে শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ পুলিশের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একেকবার একেক ধরনের কথা বলছেন। ব্যাপক জেরার মুখে রিমান্ডের প্রথমদিন সে হত্যাকাণ্ডের পুরো দায় শাহীনের ওপর চাপিয়েছে। বলেছে, শাহীন তাকে হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব দিয়েছে। সে শুধু মিশনটি বাস্তবায়ন করেছে। শাহীন কেন এটি করেছে তা সে জানে না বলেও ডিবিকে জানায়। ডিবি জানায়, এর আগে আমানুল্লাহর বিরুদ্ধে তিনটি মামলার মধ্যে খুলনার ফুলতলা থানায় একটি হত্যা মামলাও আছে। এছাড়া যশোর জেলার অভয়নগর থানায় দুটি মামলা আছে। চরমপন্থি এই নেতা নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করতে দুটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে। সবুজ রংয়ের পাসপোর্ট দুটিতে তার প্রকৃত নাম-পরিচয় গোপন করা হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তার আইফোনটিতে বাংলাদেশের কোনো সিম ব্যবহার করে না। ইন্দোনেশিয়ান দুটি নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করত এই শিমুল ভূঁইয়া। অপর আসামি তানভীর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে খুলনা জেলার ফুলতলা থানায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের দুটি মামলা আছে।
এদিকে ডিবি হেফাজতে আসামিদের দ্বিতীয় দিনের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঘটনার তদন্তে বাংলাদেশে আসা ভারতীয় দল। বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আমানুল্লাহর কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সেই তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে ভারতে। সে অনুযায়ী ভারতের বিভিন্ন স্থানেও অভিযান চালানো হচ্ছে।
ঢাকার তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমপি আনারের লাশ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। এমনকি ভিকটিমের শরীরের মাংস পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কারণ, হত্যার পর এমপির লাশ শুধু টুকরো টুকরো করাই হয়নি। শরীরের হাড় থেকে মাংস আলাদা করা হয়েছে। মাংসগুলো টুকরো টুকরো করে সেখানে হলুদ মিশিয়ে পলিথিনে রাখা হয়। পরে শরীরে টুকরোগুলো বেশ কয়েকটি ট্রলি ব্যাগে করে বাসা থেকে বের করা হয়। ট্রলি ব্যাগগুলো কয়েক দফায় হাতবদল হয়েছে। তাই এগুলো উদ্ধারে তদন্তসংশ্লিষ্টদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ভিকটিমের শরীরের মাংস উদ্ধার করতে না পারলেও হাড় উদ্ধারের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তদন্তের অংশ হিসাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ডিবির একটি দল শিগগিরই কলকাতায় যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, এমপি আনারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড শাহীনের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালান এবং হুন্ডি ব্যবসাসহ নানা বিষয়ে বিরোধ ছিল। টানাপোড়েন চলছিল আর্থিক লেনদেন নিয়েও। আনার এবং শাহীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ঝিনাইদহের মহেশপুর এবং চুয়াডাঙ্গার দর্শনা গেদে বর্ডার স্বর্ণ চোরাচালানের অন্যতম রুট। এই রুটকে ঘিরেই আনারের সঙ্গে শাহীনের সম্পর্ক। চোরাচালানকে কেন্দ্র করে ২০০৭ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। ওই মামলায় আনারকে আসামি করা হয়েছিল। পরে তার বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেওয়া হয়। এমনকি তার নামে জারি হয়েছিল ইন্টারপোলের রেড নোটিশ। পরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রত্যাহার করানো হয়।
সূত্র আরও জানায়, বন্ধু আক্তারুজ্জামান শাহীনের ব্যবসায়িক ক্ষোভ ও পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহর সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই কাল হয়েছে এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের। শাহীন এবং আমানের পরিকল্পনা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি আনার। তাকে কৌশলে বাংলাদেশ থেকে ডেকে নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয় হত্যা মিশন। পরিকল্পনার অংশ হিসাবে শাহীন কলকাতায় যান ৩০ এপ্রিল। শাহীনের কলকাতায় অবস্থানের বিষয়টি এমপি আনারের আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু ১০ মে শাহীন যে বাংলাদেশে চলে আসেন, তা আনারকে জানানো হয়নি। বাংলাদেশে আসার সময় শাহীন হত্যা মিশন সম্পন্ন করতে আমানুল্লাহকে দায়িত্ব দিয়ে আসে। তাকে বলা হয়, কোনোভাবেই যেন কাজটা মিস না হয় এবং কোনো প্রমাণ যেন না থাকে। এদিকে ১২ মে এমপি আনার ভারতের কলকাতায় যান এবং তার বন্ধু গোপালের বাসায় উঠেন। পরদিন অর্থাৎ ১৩ মে এমপি আনারকে তার বন্ধুর বাসা থেকে ডেকে আনেন শাহীন। তিনি যে বাংলাদেশে এসেছেন তা গোপন করে বলা হয়, তিনি কলকাতা নিউটাউনের বাসায় আছেন। ওই বাসার পাশের একটি ঠিকানা দিয়ে বলেন, তার (শাহীন) লোক আনারকে রিসিভ করবেন। সে অনুযায়ী শাহীনের লোকজন এমপিকে রিসিভ করে গাড়িতে ওই বাসায় নিয়ে যায়। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এমপি আনার।
কলকাতা থেকে এসে গুলশানের যে ফ্ল্যাটে ছিলেন শাহীন : এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহীন ১০ মে দেশে ফিরে ওঠেন রাজধানীর গুলশান দুই নম্বরের ৬৫ নম্বর রোডের ১৭ নম্বর হাউজের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ফ্ল্যাটে বসেই তিনি হত্যার সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন। শুক্রবার বিকালে গুলশানের ওই বাসায় গিয়ে জানা যায়, ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন শাহীন। ফ্ল্যাটটিতে যেতে চাইলে বাধা দেন নিরাপত্তা প্রহরীরা। জানা যায়, ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটে বিদেশি নাগরিকসহ ভিআইপিরা থাকেন। রয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী মো. আজাদ জানান, গত ৬ মাস ধরে বিভিন্ন শিফটে এ ভবনের দায়িত্বে আছেন তিনি। এ সময়ের মধ্যে কয়েকবার শাহীনকে ফ্ল্যাটে আসতে দেখেছেন। বেশিরভাগ সময় ফ্ল্যাটে থাকতেন না শাহীন। মাঝে মধ্যে আসতেন। তার সঙ্গে অনেকেই আসত। তবে স্ত্রীকে নিয়ে খুব একটা আসতেন না বাসাটিতে।
তিনি আরও জানান, ২১ মে দুপুরে ডিবি পুলিশের একটি টিম ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালায়। এর একদিন আগেও ফ্ল্যাটে ছিলেন শাহীন। ডিবির অভিযানের সময় শাহীনের ম্যানেজার সঙ্গে ছিলেন। অভিযান শেষে ফ্ল্যাটটি সিলগালা করা হয়। ফ্ল্যাটের দরজাতে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে নোটিশ। শাহীনের বিষয়ে তিনি বলেন, কারও সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। যখন বাসায় থাকতেন সারা দিন পার্সেলের মাধ্যমে খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস কিনতেন।