বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন, ১৪৩০, ১৭ শাবান, ১৪৪৫

জাফর ভাই : এক সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতি

 

অনন্তের পথে চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশবরেণ্য চিকিৎসক ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আমাদের সবার প্রিয় জাফর ভাই।

তিনি অনেকদিন ধরেই গুরুতর অসুস্থ, সপ্তাহে দুই-তিন দিন ডায়ালাইসিস করতে হতো। করোনায়ও আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বারবার অফুরন্ত জীবনীশক্তির জোরে রোগ-ব্যাধিকে পরাজিত করে ফিরে এসেছেন।

এবারও যখন তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, আমার মনের মধ্যে আশা ছিল শেষ পর্যন্ত তিনি জীবনজয়ী হয়ে ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে। আমাদের দুর্ভাগ্য, তিনি আর ফিরতে পারলেন না। বিভিন্ন উপলক্ষ্য ও বিষয়ে তার সঙ্গে আর দেখা ও কথা হবে না।

জাফর ভাইয়ের সঙ্গে আমার সব শেষ দেখা হয়েছিল ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীসহ রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ওই অনুষ্ঠানে। মনে পড়ছে, অসুস্থ শরীর নিয়েও মৃদুকণ্ঠে হলেও জাফর ভাই দেশের কথা, জনগণের কথা, গণতন্ত্রের কথা বলছিলেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ফাঁকে হেঁটে হেঁটে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন। এক পর্যায়ে জাফর ভাই যে টেবিলে বসেছিলেন, সেখানে এসে কুশল বিনিময় করেন এবং স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। জাফর ভাই তখনও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপিসহ বিরোধীদলের সঙ্গে সংলাপের অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি খানিকটা বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, এই অবস্থায়ও তিনি দেশের কথা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা ভোলেননি।

১৮ মার্চ সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে জাফর ভাইকে মুক্তিযুদ্ধ, চিকিৎসা ও সমাজসেবায় জীবনব্যাপী অবদানের জন্য গুণিজন সম্মাননা, ২০২৩ প্রদান করা হয়। বঙ্গভবনের অনুষ্ঠানের আগে সেটাই ছিল সম্ভবত জাফর ভাইয়ের সর্বশেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। সেখানেও তিনি দেশ ও জাতির অগ্রগতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর দর্শন, জনগণের কল্যাণ নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সবাই মিলে দায়িত্ব নিলে বাংলাদেশকে সুইজারল্যান্ডে রূপান্তরের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তা ৫ বছরেই বাস্তবায়ন করে দেখানো সম্ভব।

জাফর ভাই এভাবেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখেছেন এবং স্বপ্ন দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, জাফর ভাইও সেই স্বপ্নের অংশীদার।

বস্তুত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তার জীবনের সোনালি সময়ে ইউরোপে নিশ্চিত জীবন ও কর্মজীবনের হাতছানি ত্যাগ করে জানবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। স্বাধীন বাংলাদেশেও চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল, গণবিশ্ববিদ্যালয়, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ, গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। গত পাঁচ দশকে লাখ লাখ মানুষ এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সেবা ও সহায়তা পেয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজসেবার পাশাপাশি যে অসামান্য অবদান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আমাদের দেশ ও সমাজে অবিস্মরণীয় করে রাখবে, তা হচ্ছে ১৯৮২ সালে জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়নে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা। এর মধ্য দিয়ে দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ঘটেছে; ওষুধের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে। এর ফলে বাংলাদেশের ওষুধ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।

আমাদের দেশের একটি রেওয়াজ হচ্ছে-জীবিত অবস্থায় গুণীর কদর হয় না। প্রবাদে আছে, বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৮ সালের ৮ মার্চ তার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। বন্ধুকে ‘মোতিহার’ সম্বোধন করে কবি ওই চিঠিতে তার মৃত্যু-পরিবর্তী সংবর্ধনা সম্পর্কে লেখেন, ‘তারপর হয়তো বা বড়ো বড়ো সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়তো আমার নামে! দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী বিশেষণের পর বিশেষণ! টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পড় মেরে বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দর শ্রদ্ধানিবেদনের শ্রাদ্ধ-দিনে বন্ধু! তুমি যেন যেয় না। যদি পার, চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোনো একটি কথা স্মরণ কোরো।’

স্বীকার করতে হবে, জাফর ভাই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আন্তরিক মর্যাদা ও সম্মান, অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পেয়েছেন। এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার’ পেয়েছেন। মৃত্যুর পরও তিনি দলমতনির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেলেন। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তা প্রতিফলিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, জাফর ভাইয়ের জীবন, কর্ম ও আত্মত্যাগ বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করবে।

এ কে আজাদ : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাইমস মিডিয়া লিমিটেড; সভাপতি, নোয়াব