শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ, ১৪৩১, ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

নয়াপল্টন-কাকরাইল রণক্ষেত্র

আজ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

 

বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে শনিবার রাজধানীতে ব্যাপক সংঘাত ও সহিংসতা হয়েছে। পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় পালটাপালটি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে; যা নয়াপল্টন, পল্টন, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, রাজারবাগ, শান্তিনগর, কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকে শুরু হয়ে থেমে থেমে তা চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। মুহুর্মুহু টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জে এসব এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

এ সময় এক পুলিশ কনস্টেবলসহ দুজন নিহত হয়েছেন। নিহত আরেকজন মুগদা থানা যুবদলের ৭নং ওয়ার্ডের এক নম্বর ইউনিটের সভাপতি বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তার নাম শামীম মোল্লা। এছাড়া অন্তত ১৫ সাংবাদিক, ১০০ পুলিশ ও ২৫ আনসার সদস্য এবং বিএনপি নেতাকর্মীসহ তিন শতাধিক আহত হয়েছেন।

যদিও বিএনপি বলেছে, দলটির সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ কয়েকটি পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়েছেন। এছাড়া পুলিশ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে থাকা অ্যাম্বুলেন্সসহ সাতটি যানবাহন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, বিআরটিসির বাসসহ বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক ঘণ্টা চলার পর শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয়ে যায় বিএনপির মহাসমাবেশ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। অন্যদিকে বিএনপির অভিযোগ, বিনা কারণে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী মিলে হামলা করে। এর প্রতিবাদে আজ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা করে দলটি। একই কর্মসূচি (হরতাল) পালন করবে গণতন্ত্রমঞ্চ, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল ও জোট।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাতে এক বিবৃতিতে জানান, শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত তাণ্ডব ও সশস্ত্র হামলা নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক। এ ঘটনায় একজন নিহতসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এমনকি পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও গুলিতে মঞ্চে থাকা সিনিয়র নেতারাও আহত হন। গ্রেফতার করা হয় তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে।

ঘটনার সূত্রপাতের বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পূর্বঘোষিত নয়াপল্টনের মহাসমাবেশে অংশ নিতে এদিন ভোর থেকে নয়াপল্টনে আসতে শুরু করেন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সকাল ১০টার আগেই একদিকে আরামবাগ, অন্যদিকে মৎস্য ভবন, পল্টন মোড়, শান্তিনগর মোড় পর্যন্ত সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীদের পদচারণায় পূর্ণ হয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মগবাজারের দিক থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের দুটি মিছিল কাকরাইল পার হওয়ার সময় মূলত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কাকরাইল পার হওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটের সামনে সমাবেশের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। এ সময় ভোর থেকে কাকরাইলে অবস্থানরত বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হন। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়া। এরপর বেলা সোয়া ১২টার দিকে কাকরাইল মসজিদের সামনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বহনকারী একটি বাস ও দুটি পিকআপ দেখে হামলা চালোনো হয়।

হামলা শুরু হলে বাস ও পিকআপ থেকে নেমে দৌড়ে স্থান ত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ওই সময় তাদের লাঠি হাতে ধাওয়া দেন বিএনপির কর্মীরা। সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিএনপির কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরই পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়া এবং কাঁদানে গ্যাসর শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ থেকেই শুরু হয় সংঘর্ষ। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে।

পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীর ফকিরাপুল চার রাস্তার মোড়ে হামলার শিকার হয়ে এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হয়েছেন। তার নাম আমিনুল ওরফে পারভেজ। বাড়ি মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে। তিনি ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। এদিন বিকাল সোয়া ৪টার দিকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, মৃত অবস্থায়ই ওই পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তার মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। আমরা ইসিজি করার পর নিশ্চিত হয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেছি।